Logo
মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২১ | ১২ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

চিকিৎসকের ফি নিয়ে নৈরাজ্য

প্রকাশের সময়: ৯:৩২ পূর্বাহ্ণ - মঙ্গলবার | জানুয়ারি ৩, ২০১৭

শরীরে  অসুখ? চিকিৎসকের কাছে যাবেন। তিনি আপনাকে দেখেই কয়েকটি রোগ পরীক্ষা করার পরামর্শ দিলেন। একবার ফি দিয়ে আসলেন। এরপর সেই পরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে গেছেন। এরপর চিকিৎসক আপনাকে ওষুধের নাম লিখে দিলেন। এই পর্যায়ে আবারও দিলেন তার ফি।

সব চিকিৎসক যে দ্বিতীয়বার এই ফি নেন, তা নয়। তবে এদের সংখ্যাটা একেবারেই হাতে গোনা। বাকিদের কেউ কেউ প্রথমবার যত টাকা নেন, রোগ পরীক্ষার প্রতিবেদন দেখে তার চেয়ে কিছু কম নেন। কেউ আবার পুরোটাই নেন। সবই চিকিৎসকের মর্জির ওপর।

জনসংখ্যার আধিক্যের এই দেশে সরকারি হাসপাতাল সব রোগীর চাপ সামাল দিতে পারে না। চিকিৎসার জন্য তাই যেতেই হয় বেসরকারি হাসপাতাল বা চিতিৎসকের চেম্বারে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থায় টাকার বিনিময়ে যেখানে দুই থেকে তিনশ টাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চিকিৎসা নেয়া যায়, সেখানে চেম্বার বা বেসরকারি হাসপাতালে এই অংকটা ক্ষেত্র বিশেষে এর দ্বিগুণ, তিনগুণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে চারগুণও।

যার যেমন ইচ্ছে তেমন ফি আদায়

 

কোন চিকিৎসক কত টাকা নেবেন-এ বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই। ফলে চিকিৎসকরা আদায় করছেন তাদের ইচ্ছে মতো। বাড়ি ভাড়ার মতোই এই ফিও বাড়ে যখন তখন।

সারা দেশেই অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক এবং মেডিকেল অফিসারা বিভিন্ন প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখে থাকেন। এসব চিকিৎসকরা রোগীদের কাছ থেকে চারশ টাকা থেকে শুরু করে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন ও ইন্টারন্যাশনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ তার বিভাগের সেরা চিকিৎসকদের একজন। তিনি রোগীদের কাছ থেকে ফি নেন মাত্র ৩০০ টাকা।

এই ভিড়ে নিতান্তই বেমানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল। তিনি বসেন রাজধানীর হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে। রোগী আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হলে তিনি প্রথমে নেন চারশ টাকা। রোগ পরীক্ষার প্রতিবেদন দেখে কখনও টাকা নেন না। কেবল প্রতিবেদন নয়, পুরনো রোগীর কাছ থেকেই তিনি টাকা নেন না বললেই চলে।’

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপিকা সুলতানা জেবুন্নাহার তৃষ্ণা প্রাইভেট প্যাকটিস করেন প্যানপ্যাসিফিক হাসপাতালে বসেন তিনি। তিনি রোগীদের কাছ থেকে প্রথমবার ফি নেন আটশ টাকা। পরের বার রিপোর্ট দেখাতে গেলে এক সপ্তাহ পরে তিনি নেন পাঁচশ টাকা।

জাতীয় অর্থপেডিকস হাসপাতালের সাবেক অধ্যাপক আবদুস সামাদ এখন চিকিৎসা দেন রাজধানীর পান্থ পথে শমরিত হাসপাতালে। সেখানে তিনি রোগীদের কাছ থেকে ফি নেন এক হাজার টাকা।  অধ্যাপক এম উ কবীর চৌধুরী চিকিৎসা দেন রাজধানীর পান্থপথের ন্যাশনাল স্কিন সেন্টারে। রোগীর কাছ থেকে তিনি প্রথম ফি নেন এক হাজার চারশ টাকা। পুরাতন রোগীদের কাছ থেকে সাতশ টাকা, আর সাত দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেখাতে আসলে কোন টাকা নেন না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌন বিভাগের প্রধান চৌধুরী মোহাম্মদ আলী প্রাইভেট চিকিৎসা দেন মালিবাগ মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসেস সেন্টারে। সেখানে তিনি রোগীদের কাছ থেকে ফি নেন এক হাজার টাকা।

সনামধন্য স্কয়ার হাসপাতালেও দেখানো যায় বিভিন্ন কনসালটেন্টদের। সেখানে তারা রোগীদের কাছ থেকে এক হাজার টাকা ফি নিয়ে থাকেন।

রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালের চোখের বিশেষজ্ঞ আরিফুর রহমান আকঞ্জি। তিনি বাসাবো নিউ ফ্রেন্ডস্ অপটিকস অ্যান্ড আইকেয়ারে চিকিৎসা দেন। তিনি রোগীদের কাছ থেকে চারশ টাকা ফি নিয়ে থাকেন। তবে রোগীরা রিপোর্ট দেখাতে এলে কোন ফি নেন না এই চিকিৎসক।

বাসাবোর পরমা অপটিকস এ চিকিৎসা করান ধানমন্ডির আল নূর হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ শেখ আনিছুজ্জামান। তিনিও রোগীদের কাছ থেকে চারশ টাকা ফি নেন।

মতিঝিল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে গাইনি রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন ফৌজিয়া ইয়াসমিন হ্যাপী, ইসমত আরা ইউসুফ, নিলুফা নাসরিন আভা। এরা রোগীদের কাছ থেকে ফি নেন সাড়ে চারশ টাকা।

রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালের প্রধান কার্ডিয়াক সার্জন লুৎফর রহমান। তিনি রোগীদের কাছ থেকে ফি নেন এক হাজার টাকা। তিনি রিপোর্ট দেখে তিনি কারও কাছ থেকে পাঁচশ-কারও কাছ থেকে সাতশ টাকা ফি নেন।

নীতিমালা নেই

চিকিৎসকদের ফি নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কোন তদারিক করে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স-১৯৮২’ অনুযায়ী বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মেডিকেল ফি, কনসালটেশন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সামরিক শাসক এরশাদের আমলে করা বলে এই আইন মানা হবে না বলে ঘোষণা দেয়া চিকিৎসকরা শুরু থেকেই এই আইন অমান্য করতে থাকে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা পরীক্ষিত চৌধুরী বলেন, ‘চিকিৎসকদের ফি নেওয়ার বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কোন প্রকার তদারিকি করা হয় না।’

এই আইনটি হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম জানিয়েছেন, এই আইনে চিকিৎসকদের ফি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে

মন্ত্রী জানান, সংশোধনীর খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। অচিরেই এটি সংসদে উঠবে। এই আইন পাস হলে চিকিৎসাখাত একটি শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসবে আশ্বাস দিয়েছেন মন্ত্রী।

চিকিৎসক নেতারা কী বলছেন?

চিকিৎসকদের ইচ্ছামতো ফি আদায় নিয়ে যোগাযোগ করেছে চিকিৎসকদের সংগঠনের  বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আইনজীবীরা যে ফি নেন তার বিষয়েতো আপনারা লেখেন না। তাহলে শুধু ডাক্তারদের বিষয়ে লেখেন কেন? বাংলাদেশে ডাক্তারদের ফি নেওয়ার ব্যাপারে কোন নীতিমালা নেই। যৌক্তিক ফি নেওয়ার নীতিমালা করলে আমরা সবাই এতে একমত হবো।’

চিকিৎসকদের আরেক সংগঠন ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- ড্যাবের সভাপতি এ কে এম আজিজুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল সবার ফি যৌক্তিক করে নির্ধারণ করা উচিত। কেবল চিকিৎসকদের নিয়ে নীতিমালা করলে সেটা তো হলো না।’

Read previous post:
ডিসিসি মার্কেটের আগুন ইচ্ছাকৃত : দোকান মালিক

রাজধানীর গুলশান-১ এর ডিএনসিসি (ডিসিসি) মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছে বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা। আবু তালেব নামে এক...

Close

উপরে