Logo
শনিবার, ০৬ মার্চ, ২০২১ | ২১শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

কিশোরগঞ্জ জেলা ও উপজেলাগুলির নামকরণের ইতিহাস

প্রকাশের সময়: ৭:৪০ অপরাহ্ণ - সোমবার | ফেব্রুয়ারি ১, ২০২১

তৃতীয় মাত্রা

সাজাহান সাজু, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জ জেলার নামকরণ উনিশ শতকের প্রথম দিকে কিশোরগঞ্জ নামটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কিশোরগঞ্জ নামকরণ নিয়ে বেশ কয়েকটি মতবেদ প্রচলিত আছে। বত্রিশ প্রামাণিক পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী কৃষ্ণদাস প্রামাণিকের ষষ্ঠতম সন্তান নন্দকিশোর একটি হাট-বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। নন্দকিশোরের নামের শেষাংশ দিয়ে গঞ্জ টি কিশোরগঞ্জ নামে পরিচিতি পায়। কৃষ্ণদাস প্রামাণিকের সাত সন্তানের একজনের নাম ব্রজকিশোর যার নামানুসারে এলাকাটির নাম কিশোরগঞ্জ হয়। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার নামকরণ জেলার নামকরণ অনুসারে। করিমগঞ্জ উপজেলা: নামকরণ- মোঘল সম্রাটের নৌ প্রধান করিম খানের নামানুসারে অঞ্চলটির নাম করিমগঞ্জ রাখা হয়। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে এখানে প্রথম থানা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। ঈশা খানের জঙ্গলবাড়ি দুর্গের দরবার গৃহ এবং বাসভবন এ উপজেলার উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থান। হোসেনপুর উপজেলা: নামকরণ- মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ এর আমলে তৎকালীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্ ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে পরগনার জনগণের অবস্থা দেখার জন্য এখানে আগমন করেন এবং দুলবাজার নামক এক জায়গায় তাবু গেঁড়ে বেশ কয়েকদিন অবস্থান করেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে এলাকাটির নাম সুলতানের নামানুসারে হোসেনপুর নাম ধারণ করে। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে এখানে প্রথম থানা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। পিতলগঞ্জ নীলকুঠি, গাংগাটিয়া জমিদার বাড়ি, কুলেশ্বরীবাড়ি কালীমন্দির ইত্যাদি হোসেনপুর উপজেলার প্রত্নসম্পদ। পাকুন্দিয়া উপজেলা: নামকরণ- এই উপজেলার মানচিত্র অনেকটা বৃত্তের মতো। পাকুন্দিয়া উপজেলা নামকরণ সম্পর্কে অনেক প্রবাদ প্রচলিত আছে। সুকুমার সেনের মতে, পাকুর এবং দিয়া শব্দ দুটো নিয়ে পাকুরদিয়া অপভ্রংশে পাকুন্দিয়া নামকরণ করা হয়। পাকুর একটি গাছের নাম এবং দিয়া শব্দের অর্থ দুপাশে নদী বেষ্টিত ভূমি। একসময় নদী বেষ্টিত এই এলাকাটিতে প্রচুর পাকুর গাছ জন্মাতো। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে এখানে থানা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। কটিয়াদী উপজেলা: নামকরণ- কথিত আছে, কটিয়াদীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আড়িয়াল খাঁ নদীর উত্তর তীরে আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন কটি ফকির নামে এক লোক বাস করতেন। বহুলোক তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর নামানুসারে এলাকাটির নাম হয় কটিয়াদী। অনেকেই মনে করেন, নীলকুঠি থেকে কটিয়াদী নামের উৎপত্তি। ইংরেজ আমলে আড়িয়াল খাঁ নদীর তীর সংলগ্ন এলাকায় অনেকগুলো নীলকুঠি এবং একটি হাট গড়ে উঠে। হাট টি নীলকুঠিহাট>কুঠি হাট অপভ্রংশে কটিয়াদি নাম ধারণ করে। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে কটিয়াদী থানা উপজেলায় উন্নীত হয়। বাজিতপুর উপজেলা: নামকরণ- মোঘল আমলের জনৈক রাজকর্মচারী বায়েজিদ খাঁ জ্ঞানী ও জনদরদী মানুষ ছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর ব্যবহারের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পায় এবং তাঁর নামানুসারে স্থানটি বায়েজিদপুর অপভ্রংশে বাজিতপুর নামকরণ করা হয়। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে এখানে থানা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। একসময় বাজিতপুর মুক্তা সরবরাহের জন্য বিখ্যাত ছিল। কুলিয়ারচর উপজেলা: নামকরণ- একসময় মেঘনা ও কালী নদীতে জলদস্যুর প্রচন্ড প্রতাপ ছিল। মোঘল সম্রাট জলদস্যু দমন করার জন্য কুলি খাঁ নামে একজন সুবেদারের অধীনে একদল সেনা পাঠান। কুলি খাঁর নেতৃত্বে জলদস্যুতা বন্ধ হয় এবং এলাকায় শিক্ষার প্রসার ঘটে। সুবেদার কুলি খাঁর নামে চরটির নাম হয় কুলিখাঁর চর অপভ্রংশে কুলিয়ার চর। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে এখানে থানা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। ভৈরব উপজেলা: নামকরণ- প্রাচীন বিটঘর (বর্তমান নবীনগর) তালুকদার ভৈরব রায় নৌবিহারের সময় মেঘনা-ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত বিস্তীর্ণ সবুজ চরাঞ্চল দেখে মুগ্ধ হোন। ভাগলপুরের জমিদার দেওয়ান আহমেদ রেজা এর অনুমতিতে ভৈরব রায় পরিত্যক্ত এ চরাঞ্চলে আবাদ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং নতুন প্রজা এনে চাষাবাদ শুরু করেন। সে থেকে অঞ্চলটি ভৈরব নামে পরিচিতি পায়। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে এখানে থানা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। নিকলী উপজেলা: নামকরণ- এককালে এইজায়গায় প্রচুর নিমগাছ ছিলো। স্থানীয় কবিরাজগণ নিমের কলি থেকে ঔষধ বানাতো। অন্যান্য এলাকা থেকেও নিমের কলি নেয়ার জন্য লোকজন এই এলাকায় আসতো। কেউ কেউ মনে করেন, নিম গাছের কলি হতে নিমকলি অপভ্রংশে নিকলী নামকরণ করা হয়। আবার অনেকের মতে, এখানকার জমিদার নিখিলচন্দ্রের নামানুসারে নিকলীর নামকরণ করা হয়। ১৭২৬ খ্রিস্টাব্দে এখানে থানা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়।
অষ্টগ্রাম উপজেলা: নামকরণ- অষ্টগ্রাম নামকরণে অনেকগুলো প্রবাদ প্রচলিত আছে। প্রবাদমতে, বল্লাল সেনের বিরুদ্ধে আট অধিসামন্ত বিদ্রোহ করে যাদের বাস ছিল এই এলাকায়, তাই এলাকাটির নাম অষ্টগ্রাম। অনেকের মতে, আটটি পৃথক গ্রামকে যুক্ত করে এ জনপদ গঠিত হয় বলে এর নাম অষ্টগ্রাম। আবার অনেকেই মনে করেন, হযরত শাহজালাল (রঃ) এর সাথে আগত আটজন আওলিয়ার সম্মানার্থে এলাকাটি আটগাঁও অপভ্রংশে অষ্টগ্রাম নামকরণ করা হয়। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে এখানে থানা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। আনুমানিক চতুর্দশ শতকে নির্মিত পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ এই এলাকার ঐতিহাসিক স্থাপত্য। ইটনা উপজেলা: নামকরণ- ইটনা উপজেলার নামকরণ নিয়ে মজার প্রবাদ প্রচলিত আছে। জমির জরিপ চলাকালে কর্মচারীরা জরিপের ইতি ঘোষণা করার পরেও দেখা গেলো এলাকাটি আরো বড়, তাই জরিপের ইতি না। এই ইতিনা অপভ্রংশে ইটনা নামে পরিচিত হয়। তবে অনেকেই এই কাহিনীকে নিছক প্রবাদ মনে করেন। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে এখানে থানা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়।
মিঠামইন উপজেলা: নামকরণ- এলাকাটি একসময় খগড়া বনে পূর্ণ ছিল। খগড়া টিপলে মিঠা রস বের হতো। জনশ্রুতি, মন ভরানো এ মিঠা খগড়া বনের কারণে এলাকাটির নাম হয় মিঠামন অপভ্রংশে মিঠামইন অনেকের মতে, জলাভূমির গভীর পানিতে মইন নামে এক প্রজাতির ধান জন্মাতো, যার চাল অনেক মিষ্টি ছিল। স্থানীয় ভাষায় মিষ্টিকে মিঠা বলার কারণে ধানের নামে এলাকাটির নাম হয় মিঠামইন। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে এখানে থানা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়।
তাড়াইল উপজেলা: নামকরণ- তাড়াইল>তারাইল শব্দের অর্থ তারা সুন্দরীর আইল বা তারা সুন্দরীর ভূখন্ড। এই এলাকাটি জমিদার মহিম রায় তাঁর মা তারা সুন্দরীর নামে সেবা ও ধর্মকর্মে ব্যয় করার জন্য দান করেন। তাই এলাকাটি তাড়াইল নামে পরিচিতি পায়। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে এখানে থানা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। জেলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
আয়তন: ২৬৮৮.৫৯ বর্গ কিলোমিটার
জনসংখ্যা: ৩০,২৮,৭০৬ জন (আদমশুমারী ২০১১)
মোট উপজেলা: ১৩ টি (কিশোরগঞ্জ সদর, করিমগঞ্জ, হোসেনপুর, পাকুন্দিয়া, কটিয়াদি, বাজিতপুর, কুলিয়ারচর, ভৈরব, নিকলি, অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইন, তাড়াইল)। সংসদীয় আসন: ৬টি। ১৬২ (কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর), ১৬৩ (কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়া), ১৬৪ (করিমগঞ্জ ও তাড়াইল), ১৬৫ (ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম), ১৬৬ (নিকলী ও বাজিতপুর), ১৬৭ (কুলিয়ারচর ও ভৈরব)। জেলার মর্যাদা লাভ: ১৯৮৪
পাকিস্তানী দখল মুক্ত হয়: ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১ অর্থাৎ বিজয়ের একদিন পরজেলার বিখ্যাত: হাওরের মাছ ও ধান, পনির, লাঠিখেলা, পালা সাহিত্য, ঘাটু গান। দর্শনীয় স্থান: শোলাকিয়া ঈদগাহ, জঙ্গলবাড়ি, এগারোসিন্ধুর দুর্গ, চন্দ্রাবতীর মঠ, হাওর, পাগলা মসজিদ, দিল্লীর আখড়া, গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির প্রাচীন স্থাপত্য ইত্যাদি।

Read previous post:
গাজীপুরের সালনায় বিপুল পরিমান ইয়াবাসহ আটক ৬

তৃতীয় মাত্রা আরিফ মন্ডল, শ্রীপুর, গাজীপুর প্রতিনিধি : গাজীপুর সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ সালনা এলাকা থেকে বিপুল পরিমান ইয়াবা ট্যাবলেট সহ...

Close

উপরে