Logo
শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২০ | ১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের অর্ধশত বছরে উপকূল দিবস

প্রকাশের সময়: ৬:৪৮ অপরাহ্ণ - বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ১২, ২০২০

তৃতীয় মাত্রা

ভয়াল ১২ নভেম্বর উপকূল জীবন-ইতিহাসের এক ভয়াবহ কালরাত। ১৯৭০ সালের এই দিনে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। উপকূলীয় দ্বীপচরসহ বহু এলাকার ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে বিরান জনপদে পরিণত হয়। এই ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতার কথা মনে হলে আজও অনেকে শিউরে ওঠে; প্রবীণরা বর্ণনা দিতে গিয়ে হু হু করে কেঁদে ওঠেন।

ঘূর্ণিঝড়ে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ভোলা এবং তৎকালীন নোয়াখালী (নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর) উপকূলে। রামগতি, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, ভোলা ও পটুয়াখালী পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে। তজুমদ্দিন উপজেলায় এক লাখ ৬৭ হাজার মানুষের মধ্যে বেঁচে ছিল মাত্র ৭৭ হাজার। মনপুরা দ্বীপের ৩২ হাজার মানুষের মধ্যে ২০ হাজার মানুষ সেই ভয়াল রাতে প্রাণ হারায়। সাগর, নদী, খাল-বিলে ভেসেছিল অসংখ্য লাশ। স্বাভাবিকভাবে মৃতদেহের সৎকার করাও সম্ভব হয়নি। ঘরবাড়ি, স্বজন হারিয়ে পথে বসেন উপকূলের লাখ লাখ মানুষ। ওই সময়ে মানুষ আবহাওয়ার পূর্বাভাসও সঠিকভাবে পায়নি। কারণ আজকের মতো যোগাযোগব্যবস্থা সেদিন ছিল না। এই বছর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের অর্ধশত বছর পূর্ণ হবে।

জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডাব্লিউএমও) বিশ্বের পাঁচ ধরনের ভয়াবহ প্রাণঘাতী আবহাওয়া ঘটনার শীর্ষ তালিকায় বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ভয়াল ঘূর্ণিঝড়টি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করেছে। তথ্য মতে, ১২ নভেম্বর সন্ধ্যা থেকে ১৩ নভেম্বর ভোর পর্যন্ত বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) উপকূল অঞ্চলে সর্বকালের প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড়টি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৮৫ কিলোমিটার গতিবেগে আঘাত হানে। ১৫ থেকে ২৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপগুলো প্লাবিত হয়। এ পর্যন্ত রেকর্ডকৃত ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ থেকেও উপকূলের জন্য ১২ নভেম্বর দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘূর্ণিঝড় লণ্ডভণ্ড করে দেয় উপকূল। এই ঘূর্ণিঝড় গোটা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এটি সিম্পসন স্কেলে ক্যাটাগরি ৩ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় ছিল। উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়কে ‘ভোলা সাইক্লোন’ও বলা হয়। এ ছাড়া দেশের মহান স্বাধীনতাসংগ্রামের একটি পরোক্ষ কারণও প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়।

ঘূর্ণিঝড়ের বাতাস, জোয়ার-ভাটার বিস্তৃতি ও লবণাক্ততার প্রভাব—এই তিনটি নির্দেশ উপকূলীয় ১৯টি জেলার আওতাভুক্ত; এর মধ্যে ১৬ জেলা প্রত্যক্ষ উপকূল। এগুলো হলো পূর্ব উপকূলে ছয় জেলা—কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর; মধ্য উপকূলে সাত জেলা—ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, শরীয়তপুর এবং পশ্চিম উপকূলে তিন জেলা—খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা। বাকি তিন জেলা অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ, পরোক্ষ উপকূল; তা হচ্ছে—যশোর, নড়াইল ও গোপালগঞ্জ। টেকনাফের নাফ নদের মোহনা থেকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল-কালিন্দী পর্যন্ত উপকূল অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার তটরেখা। এসব উপকূলজুড়ে রয়েছে সংকট ও সমস্যা; তেমনি রয়েছে অবারিত সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিকাশের ধারা। জাতীয় অর্থনীতিতে উপকূল জিডিপির কমবেশি প্রায় ২৫ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিপুলসংখ্যক মত্স্যজীবী সমুদ্র-নদীতে মাছ ধরে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। সেই আহরিত মাছ জাতীয় অর্থনীতির বড় অংশীদার।

উপকূলের সংকট, সমস্যা, সম্ভাবনা এবং মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার দাবি আদায়ে উপকূলের জন্য একটি বিশেষ দিন অপরিহার্য। তাই আমরা উপকূল ফাউন্ডেশন ১২ নভেম্বরকে ‘উপকূল দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চাই। কেননা উপকূলের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ; উপকূলকে প্রাকৃতিক বিপদ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবমুক্ত রাখা; উপকূলের দিকে নীতিনির্ধারণী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ; উপকূলের মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা; উপকূলের সব সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক বিকাশের ধারা সুগম করা; উপকূলের দিকে দেশি-বিদেশি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নজর বাড়ানো; উপকূলের ইস্যুগুলো জাতির সামনে সহজে তুলে ধরাসহ ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের সাইক্লোনে নিহতদের স্মরণ। ‘উপকূল দিবস’ হলে বিষয়গুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। প্রাথমিকভাবে ২০১৫ সালে উপকূল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ‘উপকূল দিবস’-এর দাবি ওঠে। পরবর্তী ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে উপকূল ফাউন্ডেশন সীমিত পরিসরে ‘উপকূল দিবস’ পালন এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি করে আসছে।

২০১৯ সালে বৃহৎ পরিসরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন শেষে গোলটেবিল আলোচনায় সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান ১২ নভেম্বরকে ‘উপকূল দিবস’ ও ‘উপকূল উন্নয়ন বোর্ড’ কেবিনেটে উপস্থাপন করার আশ্বস্ত করেন। দেশের বিভিন্ন স্থানেও উপকূল ফাউন্ডেশন ‘উপকূল দিবস’-এর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি জানিয়ে কর্মসূচি পালন করে আসছে। উপকূল ফাউন্ডেশনের পাশাপাশি অন্যান্য সংগঠনও দাবির পক্ষে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে—গণমাধ্যকর্মীদের সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, কিশোর-তরুণদের ফোরাম ইত্যাদি। মহান স্বাধীনতার পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হলেও ভয়াল ১২ নভেম্বর দুর্যোগের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আজও মেলেনি। উপকূলের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত বহুমুখী দুর্যোগের সঙ্গে বাস করে। ঝড়ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ এক জনপদের নামই উপকূল। বৈরী প্রতিকূলতা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততার প্রভাব নিয়ে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে ফেরে উপকূলের শ্রমজীবী মানুষ। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ১৯৭০ সালের ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের পাঁচ দশকে সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। ১২ নভেম্বরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘উপকূল দিবস’ হিসেবে পালন করার দাবি বাস্তবায়ন করবে।

প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ের অর্ধশত বছরে বাস্তবায়ন হোক ১২ নভেম্বর ‘উপকূল দিবস’। বাংলাদেশে ‘উপকূল দিবস’ পালন শুরু হলেই বিশ্বে প্রথমবারের মতো এ ধরনের একটি দিবস উদযাপন হবে। শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই এ দিনটি ‘ওয়ার্ল্ড কোস্টাল ডে’ তথা ‘বিশ্ব উপকূল দিবস’ হওয়া উচিত বলে দাবি করি।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, উপকূল ফাউন্ডেশন।

Read previous post:
পঞ্চম বারের জন্য আইপিএল জয়ের পর মুম্বই ড্রেসিং রুমে কী বলেন অধিনায়ক রোহিত?

তৃতীয় মাত্রা এ যেন ফুটবলে ব্রাজিল এবং ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার মতো পরিস্থিতি। সব দল একদিকে তো অন্যদিকে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। পঞ্চমবারের জন্য...

Close

উপরে