Logo
সোমবার, ২১ জুন, ২০২১ | ৭ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পা নেই, হাতুড়ি-রেঞ্জেই ঘুরপাক খাচ্ছে “মেইল”র জীবন চাকা!

প্রকাশের সময়: ৪:০৬ অপরাহ্ণ - মঙ্গলবার | জুন ৮, ২০২১

তৃতীয় মাত্রা

নূরে আলম সিদ্দিকী নূর, বিরামপুর থেকে : ডান-পায়ের একটি আঙুলে ছোট একটি ঘা, হাতপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক সেই আঙুল কেটে ফেলার পরামর্শ দেন। আঙুলটি কেটে ফেলা হয় হয়। সমস্যা তবুও থেকেই যায়। কিছুদিন পর পায়ের পাতা (ফুট) কেটে ফেলা হয়। কয়েকমাস যেতে না যেতেই পায়ে আবার ঘা ও তীব্র ব্যথা হওয়ায় হাঁটুর নিচের অংশটুকু (লেগ) অপারেশনের মাধ্যমে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এরপরও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ডাক্তার অবশেষে উরুর নিচ থেকে দুটি পা (থাই) কেটে বিচ্ছিন্ন করে দেন। এখানেই শেষ নয়, কয়েকবার অপারেশনের পাশর্^প্রতিক্রিয়ায় পা হারানোর সাথেসাথে হারিয়ে ফেলেন দুই কানের শ্রবণ শক্তিও।

দুই পা ও কানের শ্রবণ শক্তি হারিয়ে থমকে যায় সাহসী মোজাম্মেল হক (৫৭) এর জীবন। যৌবনকালে মোজাম্মেল হকের টগবগে শরীরে অদম্য তেজ, শক্তি আর অসীম সাহসের কারণে গ্রামের মানুষ তার নাম দিয়েছিলেন- “মেইল”। গ্রামের ছোটবড় সবাই তাকে “মেইল” নামেই চেনেন আর ডাকেনও তাই। ছুটে চলার দূরন্ত পা হারিয়ে মোজাম্মেল হকের শরীরে আগের সেই তেজ ও শক্তি না থাকলেও মনের মধ্যে রয়েছে তীব্র সাহস। আর এ সাহসের কারণেই তিনি ভেঙে পড়েননি এবং কারও মুখাপেক্ষী হননি। সেই থেকে পায়ের বদলে তার শক্ত দুই হাতের উপর ভর করে জীবন ও জীবিকার তাগিদে ঘুড়ে দাঁড়িয়েছেন মোজাম্মেল হক।

দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কুন্দন গ্রামের বাসিন্দা মোজাম্মেল হক। গ্রাম সংলগ্ন পশ্চিমে কুন্দনবাজার। সপ্তাহের দুইদিন ছাড়া দূরদূরান্তের মানুষের এ বাজারের আসা-যাওয়া খুবই কম। বাজারের প্রধানগলিতেই মোজাম্মেল হক একটি ছোট্ট দোকানঘরে সাইকেল-ভ্যান মেরামতের কাজ করেন। আর বাজার সংলগ্ন কুন্দন গ্রামেই তার বাড়ি। পাশাপাশি সাইকেল-ভ্যানের ছোট আইটেমের পার্টস বিক্রি করেন। পায়ের চিকিৎসা করে পুঁজি হারা মোজাম্মেল দোকানে মেকানিক্স পার্টস তুলতে পারছেন না কয়েকবছর ধরে। দুই পা ও শ্রবণহীন মোজাম্মেল হকের দোকানে আসা কাস্টমাররা উচ্চস্বরে বা কাগজের মধ্যে সমস্যার কথা লিখে দিলে কাস্টমারদের সাইকেল ও ভ্যান মেরামত করে দিচ্ছেন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। তারপর কাজ শেষে হাসিমূখেই ফেরেন কাস্টমাররা। তার এ স্বল্প পুঁজির ব্যবসায় সারাদিনে প্রায় সাড়ে ৩শ থেকে ৪শ টাকা আয় হয়, আর তা দিয়েই টেনেহেঁচড়ে চলে তার অভাবের সংসার।পৈত্রিকসূত্রে যৎসামান্য যে জমি পেয়েছিলেন তা ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। এখন মাটির নড়বড়ে ঘরেই স্ত্রীকে নিয়ে চলছে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসার। পা হারিয়েও স্ত্রী-সন্তানদের কাছে বোঝা হতে চাননি বলে তিনি এখনও তার শক্ত দু‘হাত দিয়ে হাতুড়ি-রেঞ্জ ঘুড়িয়ে নিজের জীবনের মোড় ঘুরানো অদম্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।মোজাম্মেল হকের দোকানে ভ্যান মেরামত করে নিতে আসা দেশমা গ্রামের ভ্যানচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, “মেইল ভাইয়ের পা না থাকলেও হাতে তার অনেক শক্তি। আর তিনি অনেক ভাল কাজ জানেন। তাই তো আমার ভ্যানের কোনো সমস্যা হলে দূর হলেও তার কাছে এসে ভ্যান ঠিক করে নিয়ে যাই।”

কুন্দন গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম রিপন বলেন, “গ্রামের মানুষের নিকট মেইল ভাই একজন অত্যন্ত ভদ্র ও বিনয়ী। সবার সাথে তার ভালো সম্পর্ক। তার জীবনে এতবড় একটি দুর্ঘটনা ঘটার পরও তিনি অন্যের উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেন এ বিষয়টি এলাকার মানুষকে অবাক করেছে এবং তিনি সবার নিকট এখন একটি অনন্য উদাহরণ।”

নষ্ট হওয়া একটি ভ্যান মেরামতকালে মোজাম্মেল হকের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, প্রায় পনের বছর আগে আমার ডান পায়ের একটি আঙুলে ছোটো একটি ঘা থেকেই আমার জীবনে আজকের এ অবস্থা। এ ঘটনার পর থেকে আমি কারও উপর বোঝা হয়ে থাকতে চাইনি। সাইকেল ও ভ্যান মেরামত করে যা আয় হয় তা দিয়েই কোনোমতে আমার সংসার চলে। পুঁজির অভাবে দোকানে কাস্টমারের চাহিদা মত মালামাল কিনতে পারি না। ফলে দোকানে বিভিন্ন মেকানিক্স আইটেম না থাকায় অনেক কাস্টমার কাজ করায়ে ফেরত যান, এতে করে কাজও কম হয়। সরকার থেকে আর্থিক সহযোগিতা পেলে আমার ব্যবসাটা আরও বড় করতে পারতাম”।

৫নং বিনাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “মোজাম্মেল হকের শারীরিক সমস্যার বিষয়টি বিবেচনায় এনে তাকে প্রতিবন্ধীভাতা কার্ড দেয়া হয়েছে। আর তার ব্যবসায়ীক পুঁজি বাড়ানোর জন্য সরাসরি আর্থিক অনুদান দেয়ার ব্যবস্থা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেই। তবে তার এ বিষয়ে আমি ইউএনও স্যারের সাথে কথা বলব।”

এ বিষয়ে কথা হলে বিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পরিমল কুমার সরকার বলেন, “মোজাম্মেল হক তার দুটি পা হারিয়েও অন্যের উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজে পরিশ্রম করে স্বাবলম্বী হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন- এটি সমাজের আট-দশটা মানুষের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উপজেলা প্রশাসন এসব পরিশ্রমী মানুষের পাশে সবসময়ই থাকবে। মোজাম্মেল হকের পারিবারিক ও আর্থিক অবস্থা ভালোভাবে যাচাই করে এই ঘটনার সাথে যা সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হবে সেটি ধরেই তার ব্যবসার মুলধন বৃদ্ধির জন্য সরকার থেকে আর্থিক অনুদান দেয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে।”

Read previous post:
হোমনা পৌরসভায় পানি সংযোগ প্রত্যাশীদের নিবন্ধন কার্যক্রমের উদ্বোন

তৃতীয় মাত্রা শফিকুল ইসলাম পলাশ, হোমনা থেকে : কুমিল্লার হোমনায় পৌরসভার সরবারাহকৃত পানি সংযোগ নিতে আগ্রহী গ্রাহকদের নিবন্ধন কার্যক্রমের উদ্বোধন...

Close

উপরে