• Saturday, 10 December 2022
বুড়িমারীর ছামিনুরের প্রতারণায় দিশেহারা শরীয়তপুরের শারমিন

বুড়িমারীর ছামিনুরের প্রতারণায় দিশেহারা শরীয়তপুরের শারমিন

এবি সিদ্দিক, পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) প্রতিনিধিঃ
 
কেঁদে কেঁদে স্বামীর অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া শরীয়তপুর গোসাইরহাটের অক্ষর জ্ঞানহীন শারমিন আক্তার (২৩) বাধ্য হয়েই গণমাধ্যমের দ্বারস্থ হয়ে স্বামী কর্তৃক প্রতারণার বর্ণনা দিচ্ছিলেন।
 
শারমিনের দেয়া তথ্যমতে, কাজ করতেন ঢাকা মিরপুর মর্ডান ফ্যাক্টরিতে। দিনাজপুর রানীবন্দরে বোনের বাড়িতে বেড়াতে আসা শারমিনের সাথে ঢাকাগামী একটি বাসে ছামিনুর ইসলাম (৩৫) নামের এক যুবকের সঙ্গে আজ থেকে প্রায় চার বছর আগে প্রথম পরিচয়। যে পরিচয় তার জীবনে বয়ে আনে দুর্বিসহ যন্ত্রণার ঝড়।
 
ছামিনুরের বাড়ি লালমনিরহাট পাটগ্রাম উপজেলাধীন বুড়িমারী ইউনিয়নে। সে ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য খায়রুজ্জামানের আপন বড় ভাই। ছামিনুর প্রথম বিয়ে করা স্ত্রীর বিষয়টি গোপন রেখে দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের সম্পর্কের এক পর্যায়ে কোর্ট ম্যারেজের মাধ্যমে শরীয়তপুরের শারমিন আক্তারের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। মিরপুর-১৩ ইমান নগরের একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন শারমিন। মাঝে মধ্যে এসে আবার চলে যেতো ছামিনুর। বিয়ের প্রায় দেড় বছর পর শারমিন জানতে পারে ছামিনুর একই উপজেলার বর্তমান দহগ্রাম ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের আপন বোনকে অনেক আগেই বিয়ে করেছে এবং তার সন্তানও রয়েছে। এরইমধ্যে ছামিনুরের শুরু হয় নানা টালবাহানা। ঘরে তুলবে তুলবে করে অনেক সময় পেরিয়ে গেলে এক পর্যায় শারমিন যেনো ছামিনুরের গলার কাঁটা হয়ে যায়। ধীরে ধীরে সবকিছুই অস্বীকার করতে থাকে ছামিনুর।
 
তাই নানা চড়াই-উতরাইয়ের পর বাধ্য হয়ে স্বামীর অধিকার ফিরে পেতে ছামিনুরের এলাকা বুড়িমারীতে কয়েকবার অবস্থান করলেও সে ও তার মেম্বার ভাই খায়রুজ্জামান মিলে বিভিন্ন কৌশলে সেখান থেকে শারমিনকে বিতাড়িত করে। বিয়ের কামিননামা দেখাতে না পারায় শারমিন তার বিবাহিত স্ত্রী নন বলেও দাবি করে বসে ছামিনুর। শারমিন মুলত অক্ষর জ্ঞানহীন হওয়ায় কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই ছামিনুর সব কাগজপত্র চুরি করে নিয়ে যায়। প্রমাণের অভাবে ঘটে নানা বিপত্তি। প্রমাণ বলতে একসাথে কিছু অন্তরঙ্গ দৃশ্য ও সংরক্ষণে থাকা হলফনামার ছবি। শারমিনের মা ও প্রতিবেশীরাও এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ছামিনুর বিয়ের পর অনেকবার গোসাইরহাটে ঘুরে গেছে, আজ সে অস্বীকার করে কেনো ? শারমিনের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার তার নেই বলে জানান মা খোদেজা বেগম। কোনোরকমে চলা অভাবের সংসারে মেয়ের প্রতি ছামিনুরের এমন অবিচারে একেবারে অসহায় ও মানসিকভাবে নাজেহাল হয়ে পড়েছে শারমিনের মা।
 
জানা যায়, দহগ্রাম ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সহকারে অন্যান্য জনপ্রতিনিধিরা মিলে সমাধানের জন্য মাঝে পনেরো দিনের সময় নিলেও আজব্দি কোনো সুরাহার পথে কেউই এগিয়ে আসেননি। তবে ওইসময় পাটগ্রাম থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন শারমিন আক্তার। 
 
এদিকে এরইমধ্যে এলাকায় বাটপার ও দালাল নামে পরিচিত বকুল, শারমিনের কাছ থেকে বিচার পাইয়ে দেওয়ার নাম করে হাতিয়ে নিয়েছে ২৫ হাজার টাকা। সে ছামিনুরের প্রতারণার বিষয়টি স্বীকার করলেও টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে। পরে বকুলের স্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, শারমিন গরু বিক্রি ও লাভের ওপর টাকা নিয়ে বকুলকে মোট ২৭ হাজার টাকা দেয়। শুভ নামে আর একজন নিয়েছে পাঁচ হাজার টাকা। তবে সে ছামিনুরের ঘটনা ও টাকা নেওয়ার কথা উভয়ই স্বীকার করে। শুধু তাই নয়, বিয়ে হওয়ার আগে ও পরে স্বয়ং ছামিনুর নানাভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ২ লাখ টাকা। দিক্বিদিক ছোটাছুটি করা অসহায় শারমিন বেশ কয়েকবার স্বামীর এলাকায় গেলেও স্বামী ও তার ভাইয়ের ভাড়াটে লোকজন কর্তৃক বিতাড়িত হয়েই তাকে ফিরে আসতে হয়েছে। একবারও উঠতে পারেননি স্বামীর সংসারে।
 
অবশেষে গণমাধ্যমের নজরে আসে ছামিনুর কর্তৃক গভীর এক অদৃশ্য প্রতারণার গল্প। শারমিনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে চলে লম্বা অনুসন্ধান। মিলে যায় তার দেয়া বর্ণনার সাথে ছামিনুরের অমানবিক প্রতারণা। প্রথমবার ছামিনুরের দাবি ছিলো, শারমিনের সঙ্গে টঙ্গীর একটি বারে প্রথম পরিচয়। শারমিন একজন দেহ ব্যবসায়ী, ঠিক এমনটাই তার দুই বন্ধু আইয়ুব ও লতিফ অবগত বলে জানায় ছামিনুর নিজেই। আর তাদেরকে সেই বারে পরিচয় করে দেয় সে। কিন্তু অনুসন্ধানে দুই বন্ধুর মুখ থেকে আসে উল্টো চিত্র। তারা জানান, শারমিনের সাথে টঙ্গির কোথাও পরিচয় হয়নি, সব মিথ্যা। মুলত সে নিজেই নতুন ভাবির সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে বলে ঢাকার একটি খাবার হোটেলে দেখা করায়। ছামিনুর আরও অনেকের সাথে এমন অনৈতিক সম্পর্কে এখনো লিপ্ত রয়েছে বলে জানায় তার দুই বন্ধু।
 
বন্ধুদের ভাষ্যমতে, ছামিনুরের দেয়া প্রথম তথ্যে যখন আকাশ-পাতাল গড়মিল পাওয়া যায় তখন চলমান অনুসন্ধানে একদিন তার মুখ থেকেই বেরিয়ে আসে প্রকৃত সত্য। পাটগ্রাম উপজেলা মোড়ের একটি মিষ্টির দোকানে গল্পের ছলে সে জানায়, 'বিয়েটা করে দেখলাম তার দৌড় কতদুর। তাকে বিয়ে করেছি সত্য, সংসার করেছি, ঘরেও তুলতাম সে আলোচনাও আমার বউয়ের সাথে হয়েছে কিন্তু আর সম্ভব না। সে সবচেয়ে বড় ভুল করেছে তার আর আমার ছবি ফেইসবুকে পোস্ট করে। তাকে ডিভোর্সের চিঠি পাঠিয়েছি। এতদিনে তার মায়ের কাছে হয়ত পৌঁছে গেছে।' এসময় জানতে চাওয়া হয়, শারমিন যদি স্বাক্ষর না করে তাহলে কি করবেন। সে জানায়, অনেক আগেই তার কাছে সিস্টেমে স্বাক্ষর নিয়ে রেখেছি। উল্লেখ্য, শারমিন আক্তার যখন বুড়িমারীতে অবস্থান করেন সেসময় খায়রুজ্জামান মেম্বার ও ছামিনুর মিলে কৌশলে ফাঁকা স্ট্যাম্পে শারমিনের স্বাক্ষর নেয় বলে জানা যায়। শুধু তাই নয়, ছামিনুরের প্রথম স্ত্রীর কাছেও পাওয়া যায় এর সত্যতা। তিনিও সব অবগত বলে গল্পের ছলে গণমাধ্যমকর্মীদের জানালে শারমিনের সঙ্গে প্রতারণার সত্যতা দৃশ্যত আরও স্পষ্ট হয়। তবে তিনি শারমিনকে ছামিনুরের স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বাড়িতে জায়গা করার পক্ষে মোটেও রাজি নন বলে জানান। এদিকে ছামিনুরের দেয়া তথ্যমতে ডিভোর্সের কোনো চিঠি শারমিনের হাতে পৌঁছায়নি বলে তথ্য পাওয়া যায়। যদিও ডিভোর্সের প্রথম স্বাক্ষী শিপন এবেপারে কিছুই জানেন না বলে জানান। অথচ তার আগেই ডিভোর্সের ছবি সংবলিত তথ্য শারমিনের ইমোতে অগ্রিম পাঠিয়ে আতঙ্কিত করে তুলে ছামিনুর। আর তখনই বিষয়টি আরও পরিস্কার হয়ে যায়, বাঁকে বাঁকে ছামিনুরের প্রতারণার আসল রহস্য।
 
প্রমাণের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে শারমিন যখন দিশেহারা, ঠিক তখনি গণমাধ্যমের প্রায় ৩ মাসের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসলো মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছামিনুরের প্রকৃত চেহারা। এই ঘটনায় ঢাকার যে এরিয়াতে তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে সেই থানার কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ হলে সেখান থেকে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিতে পারে বলে জানান পাটগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ ওমর ফারুক। ছামিনুরের ভাই খায়রুজ্জামান মেম্বারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এলাকার দিক ভেবে ঘটনাটি চেপে যাওয়ার কথা বলেন। বিষয়টি হাবিবুর চেয়ারম্যানের বোনের স্বামী কর্তৃক ঘটনা বিধায় তাকে অবগত করলে তিনি এই ঘটনার কোনো দায় নিতে রাজি নন এবং যাদের ঘটনা তাদের বিষয় বলে অবগত করেন। পাটগ্রাম পৌরসভার মেয়র রাশেদুল ইসলাম সুইট জানান, আমার কাছে সেসময় বিষয়টি অবগত করলে ইউনিয়ন সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের কাছে যাওয়ার কথা বলি। এরপর আর কিছু জানি না। তবে সম্প্রতি আবারও যোগাযোগ করা হলে এসময় তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানান মেয়র।
 
এবিষয়ে ছামিনুরের নিজ এলাকা বুড়িমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তাহাজুল ইসলাম মিঠু জানান, নারীর প্রতি অবিচার এটি একটি জঘন্য অপরাধ। ছামিনুরের বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছি কিন্তু তারা ওইসময় এটিকে মিথ্যা দাবি করে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। যদি ছামিনুর এসব স্বীকার করে থাকে তাহলে অপরাধী যেই হোক তার শাস্তি হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
 
শারমিনকে বিয়ে করে অস্বীকার, এক পর্যায়ে হেনস্থা ও হয়রানি করা ছামিনুর ইসলামের এমন অনৈতিক ও অমানবিক ভয়াবহ প্রতারণার জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার ও এলাকাবাসী।

comment / reply_from