• Friday, 27 January 2023
কয়লা সংকটে দুশ্চিন্তায় ইটভাটা ব্যবসায়িরা

কয়লা সংকটে দুশ্চিন্তায় ইটভাটা ব্যবসায়িরা

আব্দুল মান্নান,নওগাঁ প্রতিনিধি.

একদিকে বাড়ছে লাফিয়ে কয়লার দাম। অন্যদিকে কোন কাগজপত্র ছাড়াই বছর বছর ইটভাটা চালু করছেন ব্যবসায়িরা। কয়লার দাম বাড়তি ও অবৈধ ভাবে ইটভাটা চালাতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করতে হচ্ছে এসব ভাটা ব্যবসায়িদের। ইটভাটায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে অবৈধভাবে চালাতে গিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান ও বন্ধের আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে তাদের। ব্যবসায়িরা বলছেন- সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স সবকিছুই দিতে হচ্ছে কিন্তু তারপরও আমরা অবৈধ। ইটভাটা পরিচালনার নিয়মের মধ্যে না পাড়ায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া হচ্ছে না লাইসেন্স। আইনে বলা হয়েছে- ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রন) আইন-২০১৩ (সংশোধিত-২০১৯) অনুসারে বিশেষ কোনো স্থাপনা, রেলপথ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা অনুরূপ কোনো স্থান বা প্রতিষ্ঠান হতে কমপক্ষে এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না।’

জেলায় প্রায় দুই শতাধিক ইটভাটা। যেখানে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে হাতে গোনা ছয়টি। যে নিয়মের কথা বলা হয়েছে কোনটি তার মধ্যে পড়ে না। তবে প্রায় সব ভাটাই এখন ‘হাওয়া ভাটা’। যেখানে জ¦ালানি হিসেবে কয়লা ব্যবহার করা হয়। ব্যবসায়ি সূত্রে জানা যায়, গত ২০২০ সালে কয়লার দাম ছিল প্রতি মেট্রিক টন সাত হাজার ৬০০ টাক থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত। ২০২১ সালের প্রথম দিকে ১৮ হাজার টাকা এবং পরে ২৫ হাজার টাকা টন হিসেবে কিনতে হয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের (২০২২) প্রথম দিকে ২৪ হাজার ৫০০ টাকা টন ছিল। কিন্তু বছর শেষে এসে প্রায় ৩২ হাজার টাকা টন হিসেবে কিনতে হয়েছে। দুই বছরের ব্যবধানে প্রতি টন কয়লার দাম বেড়েছে প্রায় তিনগুন। জেলায় প্রায় দুই শতাধিক ইটভাটা আছে। প্রতি ভাটায় গড়ে ৫০ লাখ পিস হিসেবে এ বছর প্রায় এক কোটি পিস ইট উৎপাদন হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। জেলায় যে পরিমাণ ইট উৎপাদন হয় তার ৬০ শতাংশ ইট সরকারি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হয়। এছাড়া বাঁকী ৪০ শতাংশ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত হয়।

প্রতি হাজার ইট পুড়াতে জালানি ও মিস্ত্রী খরচ প্রায় ছয় হাজার টাকা। এছাড়া ইট তৈরি থেকে শুরু করে ভাটার চুলায় প্রবেশ করতে খরচ পড়ে প্রায় চার হাজার টাকা। প্রতি হাজার ইট তৈরিতে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ পড়ে। বর্তমানে সবকিছুর দাম বেড়েছে। সে হিসেবে এ বছর এক নম্বর ইট ১৪ হাজার টাকা, দুই নম্বর ১১ হাজার টাকা এবং তিন নম্বর ইট আট হাজার টাকায় বিক্রি হবে। গড় হিসেবে প্রতি হাজার ইটের দাম পড়ে ১১ হাজার টাকা। গত বছর দাম ছিল এক নম্বর ইট ১২ হাজার টাকা, দুই নম্বর ৯ হাজার টাকা এবং তিন নম্বর ইট সাত হাজার টাকা। ভাটা থেকে ৯০ শতাংশ ইট পাওয়া যায়। বাঁকী অংশ নষ্ট হয়ে যায় যা কোন কাজে লাগে না ব্যবসায়িদের।

ইটভাটা চালাতে- জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, বনবিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমোতিপত্র, ভ্যাট-ট্যাক্স, ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স থাকতে হবে। একটি ইটভাটা চালাতে হলে প্রতি বছর সরকারি কোষাগারের জন্য প্রায় ৬-৭ লাখ গুনতে হবে মালিকদের। নওগাঁ জেলা ইট ভাটা মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলার মেসার্স এবিসি ব্রিকস ভাটার মালিক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ২০১৯ সাল পর্যন্ত আমার সবকিছু বৈধ কাগজপত্র ছিল। কিন্তু নতুন কিছু নিয়ম যুক্ত করার পর থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসন থেকে লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থ্যাৎ কাগজপত্র পাওয়ার জন্য ভাটাটি নিয়মের মধ্যে নাই। একটি ইটভাটা চালাতে হলে প্রতি বছর সরকারি কোষাগারের জন্য প্রায় ৬-৭ লাখ দিতে হয়।

আমার দুইটি ইটভাটা আছে। দুইটি ভাটার জন্য কয়লার চাহিদা প্রায় তিন হাজার মেট্রিক  টন। এ পর্যন্ত ৬০০ মেট্রিক টন কয়লা কিনা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বলা হচ্ছে ব্লক ইট তৈরি করতে। আমরা সরকারকে প্রতি বছর ভ্যাট-ট্যাক্সসহ মোটা অংকের রাজস্ব দিয়ে থাকি। কিন্তু কিছু কাগজপত্র না পাওয়ায় সবভাটাই এখন অবৈধ ভাবে চলছে। প্রশাসন কখন অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা সহ বন্ধ করে দিবে সেই আতঙ্কে দিন পার করতে হচ্ছে।

ইটের খরচ বিষয়ে তিনি বলেন, জেলায় যে পরিমাণ ইট উৎপাদন হয় তার ৬০ শতাংশ ইট সরকারি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হয়। গত বছর সরকারি কাজ কিছু কম হওয়ায় এখনো প্রায় ২০ শতাংশ ইট ভাটায় পড়ে আছে। সবকিছুর দাম বাড়তি। এতে ইট উৎপাদন করতে খরচ বেশি পড়েছে। গড়ে প্রতি হাজার ইট উৎপাদন করতে খচর পড়ছে ১০ হাজার টাকা। সেখানে বিক্রি করতে হচ্ছে ১১ হাজার টাকা। এভাবে চললে ব্যবসায় ধ্বস নামবে। বদলগাছী উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মেসার্স খান এনসন এর স্বত্ত্বাধিকারী খোরশেদ বলেন, এ উপজেলায় ২০টি ইটভাটা আছে। কয়লার দাম বাড়ায় আমরা ভাটার মালিকরা বিপদগ্রস্থ। বাজারে টিকে থাকাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ইটের দাম এবছর বাড়তে পারে। কয়লার বিকল্প হিসেবে হাওয়া ভাটায় কাঠ বা গাছ পুড়ানো সম্ভব না। যারা পুড়াবেতারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ইট ভাল হবে না। গুনগত মানও ভাল হবে না। ক্রেতারা সহজেই কিনতে চাইবে না।

তিনি বলেন- বর্তমানে ইটভাটা পরিচালনা করার জন্য আমাদের কাছে বৈধ কোন কাগজপত্র নাই। বলতে গেলে অবৈধভাবে মধ্যে আছি। এ ভাবে ভাটা চালাতে গিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার মধ্যে সময় পার করতে হচ্ছে। কারণ আমাদের ইটভাটা পরিচালনা করতে হচ্ছে। প্রায় ৮০ শতাংশ দুশ্চিন্তার ভাটায় কোটি টাকা বিনিয়োগ করা আছে। এখন সরকার থেকে যদি অভিযান চালিয়ে ভেঙে দেয় বা বন্ধ করে দেয় তাহলে ভাটার মালিকদের মাথায় হাত ও পথে বসা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। এ বছর আমার ভাটা থেকে প্রায় ৩০ লাখ ইট উৎপাদনের সম্ভবনা যা গত বছর ছিল ৪০ লাখ। এখন মাঝপথে কি হবে বলা যাচ্ছে না। আত্রাই উপজেলার বান্দায়খাড়া এলাকার মেসার্স জেকেএইচ ইটভাটার স্বত্ত্বাধিকারী সামসুল হুদা বলেন, কয়লার দাম অতিরিক্ত বেশি। এ বছর কয়লার চাহিদা প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন। এখন পর্যন্ত প্রায় ১২০০ মেট্রিক টন কয়লা কিনা হয়েছে। ২৪ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা টন পর্যন্ত কিনা হয়েছে। এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে টাকা দিয়েও কয়লা পাওয়া যাচ্ছে না। এ বছর ৬ রাউন্ড (প্রায় ৫৫ লাখ) ইট উৎপাদন করার ইচ্ছা।

তিনি বলেন, ইটভাটা পরিচালনার জন্য আমাদের সব কাগজপত্র ছিল। কিন্তু এখন নাই। আগে পরিবেশের ছাড়পত্র ও লাইসেন্স পেতে কিছু নিয়ম ছিল না। কিন্তু নতুন কিছু নিয়ম যুক্ত হওয়ার কারণে ইটভাটার পরিচালনার মুল যে কাগজ পরিবেশের ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স তা পাওয়া যাচ্ছে না। সে নিয়মের মধ্যে ইটভাটা না পড়ায় নতুন করে রেনু (নবায়ন) করে দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু তারপরও ভাটার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ভ্যাট-ট্যাক্স, ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স সবকিছুই সরকারি ফান্ডে টাকা দিতে হচ্ছে। বলতে গেলে- সরকারকে টাকা দিলেও কাগজপত্র না থাকায় অবৈধভাবে পরিচালনা করতে হচ্ছে। আমরা আশায় আছি কয়লা পাওয়া যাবে। এখন কয়লা যদি মাঝপথে না পাওয়া যায় তাহলে খুবই করুন পরিনতি হবে ইটভাটার ব্যবসায়িদের।

ঠিকাদার মেসার্স তাজ এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারি রোকন বলেন, প্রতি বছর ইটের মৌসুম আসলে দাম কমবে সেই অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু এবার তার উল্টো হয়েছে। এ বছর এক হাজার ইটের দাম প্রায় ১৪ হাজার টাকা। ইটের দাম বাড়ায় আমাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। তুলনামুলক ইটের দাম কম বেড়েছে। তবে রড ও সিমেন্টের দাম বেড়েছে বেশি।

নওগাঁ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক মো. মকবুল হোসেন বলেন, জেলায় ছয়টি ইটভাটার পরিবেশের ছাড়পত্র আছে। আইন-২০১৩ অনুযায়ী যদি অবস্থান গ্রহণ যোগ্য হয় তাহলে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। সরকার যে নির্দেশনা দিয়েছে সেটা যদি পরিপূর্ন না হয় তাহলে পরিবেশের ছাড়পত্র দেওয়া হবে না।

অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইতোমধ্যে চিঠি আমাদের কাছে আসছে। আমরা ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করবো। ব্লক ইট যদি তৈরি করে তাহলে ছাড়পত্র দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে এক কিলোমিটারের মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক বা ফসলি জমি বা বাগান থাকা বা না থাকার বিষয়ে তেমন কোন নিয়ম নাই। মোটামুটি ফাঁকা জায়গা থাকলে কেউ আবেদন করলে সরেজমিনে পরিদর্শন করে ছাড়পত্র দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। নওগাঁ জেলা প্রশাসক মো.খালিদ মেহেদী হাসান বলেন, ইটভাটার পরিচালনার জন্য কিছু  নিয়ম রয়েছে। পরিবেশসহ অন্যান্য বিষয় অক্ষুন্ন রেখে ইটভাটা পরিচালনা করে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে।

 

comment / reply_from