• Friday, 03 February 2023
কপোতাক্ষের চর দখলে মেতেছেন প্রভাবশালীরা, পুনঃখননের দাবি এলাকাবাসীর

কপোতাক্ষের চর দখলে মেতেছেন প্রভাবশালীরা, পুনঃখননের দাবি এলাকাবাসীর

রাসেল আহাম্মেদ, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি:
কবি মাইকেল মধুসুদনের স্মৃতি বিজড়িত কপোতাক্ষ নদটি যশোর হয়ে খুলনার কায়রা উপজেলার বুক চিরে শিবসা নদীতে গিয়ে মিশেছে। এই নদের প্রবল স্রোত ও  গভীরতা নিয়ে নানান গল্প ও ভীতি প্রচলিত ছিলো নদের পাশে বসবাসকৃত বাসীন্দা, পথচারী ও জেলেদের মধ্যে। নদ দিয়ে চলাচল করা বড় বড় লঞ্চ, স্টীমার, কার্গ, নৌকা এবং বড়বড় মাছ ধরার স্মৃতিবিজড়িত সেই সময়  হাতড়ে বেড়ায় এই এলাকার মানুষের স্মৃতিচারণে । কয়বার আমাদী এলাকা হইতে পাশের পাইকগাছা উপজেলার বোয়ালিয়া পর্যন্ত কিলোমিটার খরস্রোতা কপোতাক্ষ নদের অর্থেটি প্রাণ হারিয়েছে আরও অনেক আগে। বিগত চার বছর ধরে চলছে এই নদের মুমূর্ষু অবস্থা। এক সময়ের ১৫০ মিটার প্রশস্ত নদটি এখন পরিণত হয়েছে ৩-৪ মিটার সরু খালে। যেখানে জোয়ারের সময় ও ঢেউয়ের ভয়ে নৌকা পারাপর ব্যাহত হতো সেখানে এখন ভাটায় নৌকা চালানো যায় না তাই হেঁটেই নদী পার হতে হয় পথচারীদের। কপোতাক্ষ নদের এমন করুন দৃশ্যে একদিকে যেমন শঙ্কায় ও বিপাকে পড়ছে হাজার হাজর মানুষ।  আবার অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব না দিয়ে চর দখল করে রমরমা ব্যবসায় মেতে  ওঠেছেন একশ্রেণির মানুষ।
 
কপোতাক্ষ নদের শুরু বা শেষ প্রান্ত কয়রা ও পাইকগাছাস্থ পাড় ঘুরে দেখা যায় এক সমায়ের পূর্ণ যৌবনে ভরপুর থাকা বিশাল নদটি যেন অসহায়ের বেশে সরু খালের মতো হয়ে কোনো রকম নিজের অস্তিত্ব টিকে থাকতে কোঁনঠাসা অবস্থায় প্রবাহিত হচ্ছে। নদের দুই পাশের মধ্যে আশাশুনির খাজরা, রাউতাড়া, বড়দল পাড়ে জেগেছে হাজার হাজার একরের বিশাল চর। আর সেখানে চলছে চর দখল করে মাছ চাষ, কাঠ পুড়িয়ে কয়লা, শামুক কুড়িয়ে চুন এবং মাটি পুড়িয়ে ইট তৈরীর রমরমা ব্যবসা। অপার দিকে অন্য পাড় অর্থাৎ নাকসা, ধামরাইল, ফতেপুর, চাঁদখালী প্রান্তে চলছে চর দখলের মহা উৎসব। গায়ের বলে চর দখল করে বাড়িঘর থেকে শুরু করে চিংড়িঘের সহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং এছাড়াও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি বিহীন চরে গড়ে ওঠছে নতুন পুরাতন অনেক ইটের ভাটা।
 
আমাদী ইউনিয়ন পরিষদের ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আইবুর রহমান সানা জানান,  নদীতে চর পড়ে যাওয়ায় গেট থেকে পানি সরানোর কোন উপায় ছিলো না। খালের গভীরতার থেকে নদীতে চর উচু হওয়ায় এ বছর বৃষ্টির পানি না সরাতে পারায় জলাবদ্ধতায় আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। লক্ষ্যাধিক টাকা খরচ করে মাটিকাটা মেশিন দিয়ে চরের মাটি কেটেও পানি সরানো না গেলে গ্রামবাসীর সকলের প্রচেষ্টায় ধান ক্ষেতের পানি কমাতে সক্ষম হলেও তার মধ্যে নিচু জায়গার চাষীদের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়, নদীটি বাঁচানো না গেলে ভবিষ্যতে আরও খারাপ দিন আসবে। কারন হিসাবে তিনি আরোও বলেন, উপজেলা ও পাইকগাছা উপজেলার অধিকাংশ এলাকার পানি কপোতাক্ষ নদ দিয়েই নিষ্কাশিত হয় তাই নদী না থাকলে ভবিষ্যৎে এই এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রয়েছে।
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আশাশুনির খাজরা ইউনিয়নের এক বাসিন্দা বলেন, জোর যার মুল্লুক তার এমন ভাবেই জেগে ওঠা চর দখল করতে ব্যস্ত সবাই। কেউ কেউ নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে আবার অনেকে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে খুশি করে যে যেমন পারছে দখল করে খাচ্ছে, দেখভালের যেন কেউ নেই, গরীবরা সর্বদায় অসহায়।
 
কপোতাক্ষের তীরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম গাজী পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, এক সময় তাঁর বাড়ির পাশেই ছিল লঞ্চঘাট। ১০-১২ বছর আগেও এই নদে তীব্র স্রোত ছিল, ছিলো জোয়ার-ভাটার খেলা, জেলেরা নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরতো, পাড়ের মানুষ গোসল করতো কিন্তু সেই  কপোতাক্ষের দিকে তাকালে যেন অবাস্তব মনে হয়। এখন সে কথা ছোটদের বিশ্বাস করানোই কঠিন।
 
কপোতাক্ষ পাড়ের আরেক বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বছর বয়সী মতিয়ার রহমান বলেন, আমাদের যৌবনে এই নদেরও যৌবন ছিল চোখে পড়ার মতো। দূর থেকেই এই নদের শা-শা গর্জন শোনা যেত। আমাদের  বৃদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে কপোতাক্ষ নদও শুকিয়ে গেছে। আমি যেমন অর্ধেক মৃত এই নদেরও  তেমন অবস্থা। গেলো কয়েক বছর আগেও নদে ১৫-২০ হাত পানি ছিল কিন্তু গত দুই-তিন বছর ধরে ভাটার সময় নৌকাও চলে না।
 
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, উপকূলীয় উপজেলা কয়রা এমনিতেই সর্বদা দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। এরপর কপিলমুনিতে সেতু নির্মাণের নামে পিলার স্থাপন করে ২০ বছর ধরে কপোতাক্ষের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করায় নদটি মৃত প্রায় অথচ এই কপোতাক্ষ নদের প্রবাহ স্বাভাবিক না রাখতে পারলে কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকার আরও বিপর্যয় নেমে আসবে।
 
পানি উন্নয়ন বোর্ডের খুলনার প্রধান প্রকৌশলী তাহমিনুল ইসলাম বলেন, কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০২৪ সালের মধ্যে খুলনার পাইকগাছা বোয়ালিয়া থেকে কয়রা উপজেলার আমাদী পর্যন্ত ৩০ কিঃমি কপোতাক্ষ নদ পুনঃখনন করা হবে। এ খননকাজ শেষ হলে কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার জলাবদ্ধতা নিরসন হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ যোগাযোগব্যবস্থা আরো সুগম হবে। 

comment / reply_from