হরিরামপুরে চা বিক্রি করেই সংসার চালান এক সংগ্রামী নারী

78

হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) থেকে : বয়স প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। স্বামী অসুস্থতার কারণে উপার্জনের অক্ষম হয়ে পরলে সামান্য চায়ের দোকান দিয়েই সংসারের হাল ধরেন সংগ্রামী নারী নার্গিস বেগম। তিনি মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার গালা ইউনিয়নের গোয়ালবাগ গ্রামের ইব্রাহিম শিকদারের স্ত্রী। কাস্টমারদের অনেকেই তাকে খালা বলে সম্বোধন করে থাকেন। খালার চায়ের দোকান নামেই অনেকটা পরিচিতি লাভ করেছেন। কিন্তু অর্থাভাবে আর কোনো পন্য উঠাতে না পারায় সামান্য চায়ের দোকান নিয়েই কোনো রকমে টেনেহিঁচড়ে জীবনযাপন করছেন তিনি।

জানা যায়, প্রায় ৩০ বছর আগে নার্গিস- ইব্রাহিমের দাম্পত্য জীবন শুরু হয়। বৈবাহিক জীবনে তারা ২ কন্যা সন্তানের জনক জননী। মেয়ে দুজনেরই বিয়ে হয়েছে। স্বামী ইব্রাহিম শিকদার দিনমজুরের কাজের ফাঁকে ফাঁকে অটোবাইক চালিয়ে সংসার চালাতেন। কিন্ত গত প্রায় আড়াই বছর আগে স্ট্রোকে প্যারালাইসিস হয়ে পরলে কর্মক্ষমতা হারান ইব্রাহিম। এতে অসহায় হয়ে পড়ে পরিবারটি। স্বামীর অসুস্থতায় বাধ্য হয়ে জীবন সংগ্রামে নামেন নার্গিস বেগম। উপজেলার ঝিটকা বাজার (হরিরামপুর মোড়ে) জলি সুপার মার্কেটের পশ্চিম পাশের গলিতে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মো. আজিম খান এঁর পরিত্যক্ত জায়গায় ব্র্যাক এনজিও থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ছোট একটি দোকান ঘর তৈরি করেন। সেখানেই চা আর পান সিগারেট বিক্রি করেন নার্গিস বেগম। তার সাথে কোনো রকমে সহযোগিতা করেন কর্মক্ষমহীন স্বামী ইব্রাহিম। স্বল্প পুঁজির এই চা পানের দোকানই এখন তার একমাত্র জীবন চলার অবলম্বন। বছর খানেক আগে গালা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ইব্রাহিমকে প্রতিবন্ধী কার্ড দেয়া হয়। অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনে দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছেন নার্গিস বেগম। ভিটেবাড়ি টুকু ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই ইব্রাহিম শিকদার ও নার্গিস দম্পত্তির। ভরসা একমাত্র এই চায়ের দোকান, চা বানাতে বানাতে এমনটাই জানালেন নার্গিস বেগম।

তিনি আরও জানান, “আমার স্বামী অসুস্থতায় কর্মহীন হয়ে পড়ে। কোনো উপায় অন্ত না পেয়ে আমি এই সামান্য চায়ের দোকান করেই কোনো রকমে সংসারের হাল ধরেছি। মাথার ওপর রয়েছে এনজিওর ঋণের বোঝা। টাকার অভাবে একমাত্র চা ছাড়া আর কোনো মালামালও তুলতে পারছি না। এখন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬ থেকে ৭ শো টাকা বিক্রি হলেও খরচপাতি বাদ দিয়ে ২ শো থেকে আড়াই শো টাকার বেশি থাকে না। কোনো দিন তাও হয় না। এ দিয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর। তবে বেশি করে মালামাল তুলতে পারলে হয়তো আরও লাভ হতো। কিন্তু টাকা অভাবে সেটা পারছি না। ফলে অনেক কষ্ট করেই চলতে হচ্ছে। ভাইস চেয়ারম্যান আজিম ভাইয়ের সহযোগিতায় তারই জায়গায় এই ছোট ছাপড়া ঘর তুলে দোকান করছি।”

বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালীন সময়ের কারণে চায়ের দোকানও আগের মতো চলছে না বলেও তিনি জানান।

জলি সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, “খালা অনেক ভাল মানুষ। উনার স্বামী অসুস্থ হওয়ায় তিনি সংসারের হাল ধরেন এই চা-পান সিগারেটের দোকান দিয়েই। করোনাকালীন সময়ে অনেক কষ্টে জীবনযাপন করেছেন। সামান্য চায়ের দোকান করে একটা সংসার চালানো আসলে অনেক কষ্টকর। চায়ের দোকানের পাশাপাশি অন্যান্য মালামাল তুলতে পারলে হয়তো আরও ভাল হতো। কিন্তু টাকার অভাবে তিনি মালামালও তুলতে পারছেন না।”

এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মো. আজিম খান বলেন, “মহিলা খুবই ভদ্র এবং ভাল মানুষ। স্বামী স্ট্রোক করে প্যারালাইসিস হয়ে পরায় সে অসহায় হয়ে পড়েন। তার অসহায়ত্বের কথা ভেবেই আমার বাড়ির পাশেই একটা পরিত্যক্ত জায়গায় দোকান উঠানোর ব্যবস্থা করে দিই। এখানে চা পান সিগারেটের দোকানের জন্য একটা ঘর উঠানোর কথা বললে কোনো প্রকার ভাড়া ছাড়াই আমি তাকে দোকান দিতে বলি এবং যতদিন সে চায় এখানে সে দোকান করবে। এজন্য আমাকে তার কোনো টাকা পয়সা দিতে হবে না। এভাবেই সে এখানে প্রায় দুই বছর যাবৎ আছেন।”