সাতক্ষীরায় ৪৫০ বছরের পুরনো জ্বীনের তৈরি মসজিদ!

251

শেখ আমিনুর হোসেন, সাতক্ষীরা থেকে: প্রায় ৪৫০ বছর আগের প্রাচীন নিদর্শন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ভালুুকা চাঁদপুর জামে মসজিদ। কথিত আছে, মসজিদটি মাত্র এক রাতের মধ্যে তৈরি করেছিলো জ্বীনরা। অনেকে বলেন, মসজিদ আর পাশের দিঘি (পুুুকুর) এক রাতে মাটির তলা থেকে উঠেছিলো। জনশ্রুতি এবং লোকমুখে শোনা যায়, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর জামে মসজিদের এসব কথা।

প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের আগে এই মসজিদের সামনে এবং বিভিন্ন জায়গায় শতশত পানির বোতল, তেলের বোতল এবং পলিথিনে করে মাটি রেখে যান অনেকে। নামাজ শেষ হলে সেগুলো নিয়ে যান মানতকারী ব্যক্তিরা। মসজিদের সামনের প্রাচীর ঘেষা মাটি উঠিয়ে নিয়ে গেছেন অনেকে। প্রতি শুক্রবার মসজিদ সংলগ্ন মাঠে অনেকে রান্নাও করছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এখানে শুধুমাত্র মুসলিম ধর্মের মানুষ নয় সকল ধর্মের মানুষ এসে পানির বোতল, তেলের বোতল এবং পলিথিনে করে মাটি রেখে যান। নামাজ শেষ হলে নিয়ে যান সেগুলো।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় ৪৫০ বছর আগে ভালুকা চাঁদপুর গ্রামে মানিক চৌধুরী নামে এক সিদ্ধ পুরুষ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ভালুকা চাঁদপুর জমিদার বংশের সন্তান। জনশ্রুতি আছে, এই গ্রামে খালাস সরদার নামে এক দরিদ্র ব্যক্তি বাস করতেন। তিনি ছিলেন অতি পরহেজগার ও খোদাভক্ত। অলৌকিকভাবে তিনি বহু গুপ্ত সম্পদের অধিকারী হন। এ সম্পদ দিয়ে তিনি নদীয়ার রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রের কাছ থেকে তার ছেলে আজমত উল্যাহর নামে একটি জমিদারি পরগনা ক্রয় করেন। পরগনা কেনার সম্মানে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তার নাম দেন আজমত উল্যাহ চৌধুরী। পরগনা কেনার পর তা রক্ষার জন্য ১০০ বিঘা জমির চারপাশে একটি খাল খনন করেন যা গড় নামে পরিচিত। এই গড়ে ১৬ জন মাঝি নৌকায় করে দিনরাত পরগনা পাহারা দিত। কারণ সে সময় পাশের সুন্দরবনসহ বহিরাগত ডাকাতদের উপদ্রব ছিল।

জমিদার আজমত উল্যাহ চৌধুরীর ছিল ৭ ছেলে। তার মধ্যে মানিক চৌধুরী ছিলেন একজন। তিনি ছিলেন ওলিয়ে কামেল এবং বিশিষ্ট দরবেশ। জনসাধারণের নামাজের সুবিধার্থে তিনি ভালুকা চাঁদপুর গ্রামে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদের পাশেই আড়াই বিঘা আয়তনের কবরস্থান। মসজিদের দক্ষিণপাশে বিশাল দীঘি রয়েছে। দীঘিটির আয়তন সাড়ে চার বিঘা। ৪৫০ বছর পরও মানুষ এ দীঘির পানি মহৌষধ হিসেবে ব্যবহার করে।

লোকমুখে শোনা যায় নানা ইতিহাস। অনেকেই বলেন, মসজিদটি এক রাতে জ্বীনরা তৈরি করেছিল। আবার কেউ কেউ বলেন, মসজিদ আর পাশের দীঘি এক রাতে উঠেছিল। তবে এই মসজিদটি ঘিরে অনেকে মানুষ মানত করেন এবং তাদের সেই মনের আশা পূরণ হলে মসজিদে মুরগি, ছাগল, গরু, টাকাসহ বিভিন্ন জিনিস দান করেন।

দেখা গেছে, মনের আশা যাতে পূরণ হয় সে কারণে এখানে প্রতি শুক্রবারে শতশত মানুষ আসেন। তাদের কেউ আসে সন্তানের আশায়, কেউ আসে রোগমুক্তির আশায়, আবার কেউ আসে নতুন ফসলের ভালো ফলনের আশায়। ভক্তদের আগমনে প্রতি শুক্রবার এখানে মেলা বসে। ভক্তদের কেউ আসেন মোরগ নিয়ে, কেউ আসেন ক্ষেতের প্রথম ফসলের অংশ নিয়ে, কেউ বাগানের ফল, কেউ ঘেরের প্রথম ধরা মাছ, কেউ গরু-ছাগল নিয়ে। এভাবে প্রতি শুক্রবার ভক্তদের মিলনমেলায় পরিণত হয় ভালুকা চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী জামে মসজিদ প্রাঙ্গণ।

মসজিদটি ঘুরে দেখা যায়, ভক্তরা দীঘির পানিতে গোসল শেষে বোতলে পানি ভরে রাখছেন মসজিদের সামনে। এরপর মসজিদের সামনের প্রাচীরের নিচ থেকে মাটি নিয়ে রাখছেন বোতলের পাশে। নামাজ শেষে সেই পানি-মাটি পরম ভক্তিতে ব্যবহার করছেন তারা। এ দৃশ্য দু-এক বছরের নয়। ৪৫০ বছর ধরেই এমনটা চলছে।

ভালুকা চাঁদপুর দাখিল মাদ্রাসার সুপার মহসিনুল ইসলাম বলেন, ১৯৮৪ সালে আমি এই মসজিদে যখন ইমাম হিসেবে আসি তখন মানুষ মানত করে মুরগি ছেড়ে দিয়ে যেত। স্থানীয়রা যে যা পারতো নিয়ে যেত। পরবর্তীতে আমি খাঁচা ব্যবস্থা করে মুরগি বিক্রি করে টাকা মসজিদের কাজে লাগাতাম। সেই সময় আমি দেখেছি পীর মানিক চৌধুরী (রহ:) নামে মানত করতো। মসজিদের উপর ইট বেঁধে রেখে যেতেন। আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো নামে মানত করা শিরক। আমি মানুষকে আল্লাহর নামে মানত করতে বলতাম। অনেকে বাচ্চা হওয়ার পর মোরগ, ছাগল অথবা গরু জবাই করে বাচ্চার গালে ভাত দিয়ে এখানে রান্না করে মানুষকে খাওয়ান। শিরিক মুক্ত হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছি।

তিনি আরও বলেন, এই মসজিদটি মাটির তলা থেকে উঠেছে এটি সত্য নয়। তবে আমরা শুনেছি, পীর সাহেব তার কেরামতীতে জ্বীনদের মাধ্যমে এই মসজিদটি তৈরি করিয়ে নিয়েছিলেন। এই দীঘি আগে নদী ছিলো। সেটা দুই পাশে বাঁধ দিয়ে দীঘি হিসেবে ব্যবহার করতেন জমিদাররা। শুনেছি তিনি ভারত থেকে এসেছিলেন। এই মসজিদে এক সময় খান বাহাদুর আহসান উল্লা (রহ:) এসেছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন, এখানে একজন আল্লাহর বড় ওলি শুয়ে আছেন। তবে কয়েকশ’ কবরের মধ্যে ওনার কবর কোনটি সেটি তিনি দেখিয়ে দেননি। দেখিয়ে দিলে হয়তো তার কবরের মাটি পর্যন্ত থাকতো না।

মসজিদ কমিটির সভাপতি বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) ড. মঈনুর রহমান চৌধুরীর বড় ভাই লুৎফর রহমান চৌধুরী জানান, মানিক চৌধুরী নামে একজন দরবেশ ছিলেন। তিনি এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এখানকার মসজিদের সামনের মাটি ও দীঘির পানি ব্যবহার করে মানুষ। উপকার পাওয়ার পর মানুষ দান খয়রাত করে। আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি, মানুষ এখানে মানত করে মুরগি ছেড়ে দিয়ে যেত। পরবর্তীতে সেটা আমরা রক্ষণাবেক্ষণ করে সেগুলো দিয়ে মসজিদের উন্নয়নকল্পে ব্যয় করে থাকি। তিনি বলেন, প্রায় ৪৫০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদে প্রতিদিন শতশত মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। প্রথম দিকে তিনটি গম্বুজ, ৪৫ ইঞ্চি ইট সুরকি দেওয়া ছিলো। পরবর্তীতে সেটা সংস্কার করা হয়েছে। প্রতি শুক্রবার এখানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানত আদায় ও মানত করতে শতশত মানুষ আসেন। বেশি আসেন নারী। মসজিদে পুরুষের পাশাপাশি পৃথকভাবে নারীদেরও নামাজ আদায় করার ব্যবস্থা আছে। এখানে একসঙ্গে দুই হাজার পুরুষ ও ৫০০ নারী এক জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন।