মানুষ কত নির্মম! মাত্র একটি অটোভ্যানের জন্য পরিকল্পিত খুন

65

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে চাঞ্চল্যকর খুনসহ ডাকাতি মামলার রহস্য উদ্ঘাটন, ঘটনার সাথে জড়িত আসামীদের গ্রেফতারসহ ভিকটিমের অটোভ্যানসহ মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছে পিবিআই সিরাজগঞ্জ জেলা।

গত ১৯/০৫/২০২২ তারিখে অনুমান সকাল ০৭.০০টার সময় রাশিদুল ইসলাম (১৪) তার ভাইয়ের অটোভ্যান গাড়ী নিয়ে ধামাইনগর বাজারের ভ্যান ষ্ট্যান্ডে যায়। ভিকটিম রাশিদুল ইসলাম বাড়িতে ফিরে না আসায় অনুমান ০৫.০০টার সময় তার ভাই মোঃ তারিফুল ইসলাম, ভিকটিম রাশিদুল ইসলাম কে ফোন করে মোবাইল ফোন বন্ধ পায়। খোঁজাখুঁজি করে রাশিদুল ইসলামকে না পাওয়ায় রায়গঞ্জ থানায় একটি হারানো জিডি করেন, যার নং-৯৯২, তারিখ ২০/০৫/২০২২।

খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ২৪/০৫/২০২২ তারিখ দুপুর অনুমান ০২.১৫ মিনিটের সময় জানতে পারেন যে, সলঙ্গা থানাধীন ইছলাদিঘর গ্রামস্থ জনৈক অচিন্ত তালুকদারের বাঁশঝাড়ের ভিতরে গলায় গামছা পেঁচানো গাছের সাথে বাঁধা অবস্থায় একটি অ-র্ধ-গ-লি-ত লা-শ পাওয়া গিয়েছে। উক্ত সংবাদ প্রাপ্ত হয়ে তারিফুল ইসলাম ২৪/০৫/২০২২ তারিখ দুপুর অনুমান ০৩.০০টার সময় ঘটনাস্থলে এসে উক্ত অ-র্ধ-গ-লি-ত লাশের পাশে পড়ে থাকা ভিকটিমের পায়ের সেন্ডেল এবং পরনের গেঞ্জি ও পরিহিত কালো প্যান্ট দেখে তার ভাইকে সনাক্ত করেন।

সলঙ্গা থানা পুলিশ ভিকটিমের লাশের সুরতহাল প্রস্তুত পূর্বক লাশ ময়না তদন্তের ব্যবস্থা করেন। অজ্ঞাতনামা আসামীরা পরিকল্পিতভাবে রাশিদুল ইসলামকে হত্যা করে অটোভ্যান গাড়ী এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। ভিকটিমের লাশ গোপন করার উদ্দেশ্যে দুষ্কৃতিকারীরা সলঙ্গা থানাধীন ইছলাদিঘর গ্রামস্থ জনৈক অচিন্ত তালুকদারের বাঁশঝাড়ের দক্ষিণ পার্শ্বের গলায় গামছা পেঁচিয়ে পিপলটি গাছের সাথে বেঁধে রেখে কৌশলে পালিয়ে যায়।

উক্ত ঘটনায় ভিকটিম রাশিদুল ইসলামের ভাই মো: তারিফুল ইসলাম বাদী হয়ে রায়গঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করলে রায়গঞ্জ থানা পুলিশ মামলাটি তদন্ত কার্যক্রম করে। রায়গঞ্জ থানা পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই সিরাজগঞ্জ জেলা টিম উক্ত হত্যাকান্ডের বিষয়ে ছায়া তদন্ত করতে থাকে। এক পর্যায়ে রায়গঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িত মোঃ জাহিদুল ইসলাম (৪১), মোঃ আঃ লতিফ (৩৪) কে গ্রেফতার করে এবং তাদের কাছ থেকে ভিকটিমের অটোভ্যানটি উদ্ধার করে।

পরবর্তীতে অত্র মামলার বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত মামলাটির তদন্তভার পিবিআই সিরাজগঞ্জ জেলার উপর অর্পন করেন। বিজ্ঞ আদালত আদালতের নির্দেশে পিবিআই সিরাজগঞ্জ জেলা মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে। এস আই (নিঃ) ইমরান হোছাইন মামলাটি তদন্তভার গ্রহণ করেন এবং তদন্ত কার্যক্রম করে।

তদন্ত চলাকালে গত ৩০/০৮/২০২২ তারিখে রায়গঞ্জ থানা মো: হাসেন নবী @ নুরুন নবীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআই ও থানা পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় আসামী মোঃ আঃ কালাম (৩৩), মোঃ ফরিদুল ইসলাম (৩৩) কে আটকপূর্বক জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই, সিরাজগঞ্জ জেলা।

জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা ঘটনার সাথে জড়িত মর্মে স্বীকার করলে পিবিআই সিরাজগঞ্জ টিম আসামীদের নিয়ে ভিকটিমের মোবাইল ফোন উদ্ধারসহ অন্যান্য আসামীদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান পরিচালনা করে। আসামীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ৩১/০৮/২০২২ তারিখ ভোর রাত্রি ০৪.১০ মিনিটে পাবনা জেলার আমিনপুর থানাধীন চকভরিয়া গ্রামের মোঃ সামসুল মোল্লার নিকট হতে মোবাইল সেটটি উদ্ধার করাসহ গ্রেফতারকৃত আসামীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সাথে জড়িত অপর আসামী মোছাঃ সুকিতন খাতুন @ সুখী খাতুন (৪৮) কে ০১/০৯/২০২২ তারিখ রাত্রি ০১.১০ মিনিটে গ্রেফতার করা হয়। আসামীগনের দেওয়া তথ্য মতে মামলার ঘটনার সহিত জড়িত আরও একজন আসামী পলাতক আছে তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, আসামীরা সংঘবদ্ধ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইকারী দলের সক্রিয় সদস্য। তারা বিভিন্ন এলাকায় স্বামী স্ত্রী পরিচয়ে যাত্রী বেশে ভ্যান অটোরিক্সা, সিএনজি ভাড়া করে সুবিধা জনক স্থানে চালকদের হত্যা করে ভ্যান, অটোরিক্সার, অটোভ্যান, অটোবাইক, সিএনজি ছিনতাই/ডাকাতি করে নিয়ে যায়।

ঘটনার আগের দিন ১৮/০৫/২০২২ তারিখে ভূইয়াগাঁতী বাজারে চায়ের দোকানে বসে আসামীরা পরিকল্পনা করে তারা একটি অটোভ্যান/অটোরিক্সা/সিএনজি ছিনতাই করে সেটি বিক্রি করে টাকা সমানভাবে ভাগ করে নিবে। সেই পরিকল্পনা মোতাবেক ঘটনার দিন ১৯/০৫/২০২২ তারিখে সকাল অনুমান ৭/৮টার দিকে আসামী কালাম ধামাইনগর বাজারে গিয়ে ভিকটিম রাশিদুল (১৪) এর অটো ভ্যান গাড়িটি সলঙ্গা থানাধীন ভূইয়াগাঁতী বাজারে যাওয়ার জন্য ভাড়া করে।

আসামী কালাম অপর আসামী হাসেন নবীকে তাদের দলের অপর মহিলা সদস্য মোছাঃ সুকিতন খাতুন @ সুখি খাতুনকে নিয়ে নিমগাছি মাহিলা ডিগ্রী কলেজের কাছে থাকতে বলে। সেই মোতাবেক আসামী হাসেন নবী আসামী সুকিতন খাতুন @ সুখী খাতুনকে নিয়ে পূর্ব থেকে অবস্থান করতে থাকে। আসামী কালাম নিমগাছি মহিলা ডিগ্রী কলেজের নিকট আসলে পরিকল্পনা মোতাবেক আসামী হাসেন নবী আসামী সুকিতন খাতুনকে উক্ত অটোভ্যানে আসামী কালামের স্ত্রী হিসাবে তুলে দেয়। যাতে ভিকটিম এবং লোকজন বুঝতে পারে তারা স্বামী স্ত্রী। আসামী কালাম অপর আসামী হাসেন নবীকে অচিন্ত তালুকদারের বাঁশঝাড়ে যেতে বলে।

আসামী হাসেন নবী তার ভাড়া করা মোটরসাইকেল নিয়ে অচিন্ত তালুকদারের বাঁশঝাড়ে যাওয়ার জন্য রওনা করে। আসামী কালাম এবং সুকিতন খাতুন ভুইয়াগাঁতী গ্রামীন ব্যাংকের কাছে আসলে পূর্ব থেকে অপেক্ষমান আসামী ফরিদুল এবং অপর একজন আসামী উক্ত অটোভ্যানে উঠে অচিন্ত তালুকদারে বাঁশঝাড়ের নিকট আসে। আসামী কালাম ভিকটিম রাশিদুল ইসলামকে ভ্যান থেকে নামতে বলে। ইতোমধ্যে আসামী হাসেন নবী সেখানে এসে উপস্থিত হয় এবং ভিকটিম রাশিদুল ইসলামকে বাঁশের লাঠি দিয়ে স্বজোড়ে মাথায় আঘাত করে।

আসামী ফরিদুল ভিকটিমের বুকে কিল ঘুষি মারতে থাকে। আসামী কালাম এবং অপর পলাতক আসামী ভিকটিমের গলায় গামছা পেঁচিয়ে ভিকটিম রাশিদুল ইসলামকে অচিন্ত তালুকদারের বাঁশঝাড়ের মধ্যে নিয়ে যায়। আসামী ফরিদুল ভিকটিমের হাত চেপে ধরে রাখে এবং আসামী হাসেন নবী এবং সুকিতন খাতুন ভিকটিমের পা চেপে ধরে রাখে। আসামীরা ভিকটিমের মৃত্যু নিশ্চিত করে আসামী হাসেন নবী ও কালাম ভিকটিমের অটোভ্যানটি বিক্রি করার উদ্দেশ্যে চলে যায়। বাকী আসামীরা ভিকটিমের লাশ বাঁশ ঝাড়ের মধ্যে পিপলটি গাছের সাথে গলায় গামছা দিয়ে বেঁধে রেখে চলে যায়।

গ্রেফতারকৃত আসামী মো: হাসেন নবী @ নুর নবী, মোঃ আঃ কালাম (৩৩), মোঃ ফরিদুল ইসলাম (৩৩), মোছাঃ সুকিতন খাতুন @ সুখী খাতুন (৪৮), কে বিজ্ঞ আদালতে উপস্থাপন করলে তারা নিজেদেরকে অত্র ঘটনার সাথে জড়িত মর্মে স্বীকার করে স্বেচ্ছায় বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ ধারা মোতাবেক জবানবন্দী দেন।