বিরামপুরের দাইমা রাহিলা এখন ‘আইলা ঘটক’

138


– বিয়ে দিয়েছেন ১৯৯টি
– জীবিকার তাগিদে বিক্রি করছেন শীতের পিঠা

নূরে আলম সিদ্দিকী নূর, বিরামপুর : রাহিলা বিবি। বয়স ৬০ বছর। এলাকার সবাই তাকে “দাইমা আইলা” নামে একনামে চেনেন। স্বামীকে হারিয়েছেন প্রায় দেড় যুগ হল। সেই থেকে দুই ছেলেকে নিয়ে অভাবের সাথে লড়াই করেই বেঁচে আছেন আইলা। জীবিকার তাগিদে সারাদিন বাহিরে কাটলেও দিনশেষে নির্ঘুম রাত কাটে জীর্ণ কুঁড়ে ঘরে। একসময় আশপাশের গ্রামে শতশত প্রসূতি মায়ের নরমাল ডেরিভারি ও সন্তানের নাড়ি কাটার কাজটি নিপূঁনভাবে সম্পন্ন করলে এখন তার আর কদর নেই। সময়ের বিবর্তনে পেশা বদলিয়েছেন আইলা। স্থানীয় বাজারের তিনমাথা মোড়ে সন্ধায় শীতের পিঠা বিক্রি করেন। আর অবসরে করেন বিয়ের ঘটকালি।
বলছি, দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কাটলাবাজারের রাহিলা বিবি‘র কথা। শুক্রবার সকালে রাহিলা বিবি‘র বাড়ির খোলা দরজা থেকেই দেখা গেল, টিনের নড়বড়ে ছাউনির রান্নাঘরে শীল—পাটায় পিষে হরেক রকমের ভর্তা তৈরি করছেন। ভর্তার তালিকায় রয়েছে— বাদাম ভর্তা, মরিচ ভর্তা, তিলের ভর্তা, শরিষা ভর্তা আর ধনিয়া পাতার ভর্তা। বিকালে বাজারে পিঠার দোকানে এসব ভর্তা নিয়ে যাবেন বলে জানান রাহিলা বিবি।
কথা হলে রাহিলা বিবি বলেন, আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে এলাকায় আমিসহ হাতেগোনা ক‘জন দাইমা ছিলাম। প্রসূতি মায়ের ব্যাথা উঠলে রাত—বিরাতে ডাক পেতাম। ছুটে যেতাম নরমাল ডেলিভারি করাতে। সেসময় কতশত প্রসূতি মায়ের নরমাল ডেলিভারি করিয়েছি তার হিসেব নাই। নরমাল ডেলিভারির পর সন্তানের নাড়ি কেটে তবেই হাসিমুখে বাড়ি ফিরেছি। আর এ কাজের জন্য নবজাতক সন্তানের পরিবারের পক্ষ থেকে অনেকেই আমাকে খুশি মনে শাড়ি ও চাল উপহার পেতাম। তা দিয়েই চলত সংসার।
রাহিলা বিবি বলেন, আমি শুধু অন্যের সন্তানের নাড়ি কাটিনি, আমি আমার নিজের ২য় ছেলেকে জন্ম দিয়ে সেদিনই আমি নিজেই তার নাড়ি কেটেছি। আমার এ সাহস দেখে সেদিন অনেকেই হতবাক হয়েছিল। আমি আমার জীবনে যতগুলো নরমাল ডেলিভারি ও সন্তানের নাড়ি কেটেছি তারা সবাই সুস্থ আছেন। আমার বিরুদ্ধে কারও কোনো অভিযোগ নাই। এখন তো ইউনিয়নে ইউনিয়নে সরকারি ক্লিনিক ও উপজেলা শহরে প্রাইভেট ক্লিনিকের ছড়াছড়ি। সেখানে এখন ট্রেনিং পাওয়া সব ধাত্রীদের রাখা হয়েছে। ফলে এসবের দাপটে আমার আর কেউ খোঁজখবর রাখেনা। আমি আর আগের মত ডাক পাই না।
আঠারো বছর হল ডায়াবেটিকস রোগে হঠাৎ করেই মারা যান স্বামী ছায়েদ আলী। সেই থেকে দুই ছেলে নিয়ে অভাবের সংসারে অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েন রাহিলা বিবি। জীবিকার তাগিদে একেক সময় একেক ধরণের ব্যবসার হাল ধরেছেন। কখনও কাপড়ের ব্যবসা, কখনও গো—খাদ্য খড় ও ঘাসের ব্যবসা। কখনও করেছেন জ¦ালানী লাকড়ির ব্যবসা। গত কয়েকবছর ধরে এলাকায় নতুন পেশা বিয়ের ঘটকালি করছেন। এ কাজই এখন তার জীবিকা অর্জনের একমাত্র উৎস। নিজ উপজেলা ও পাশ^র্বর্তী জেলা ও উপজেলায় এ পর্যন্ত ১৯৯টি বিয়ে দিয়েছেন। এলাকায় এখন সবাই তাকে “আইলা ঘটক” নামে একনামে চেনেন। ঘটকালি করে উপহার হিসেবে যা পান তা দিয়েই অনেকটা টেনেহেঁচড়ে চলে রাহিলার বিবির অভাবের সংসার। গত দু‘বছর ধরে করোনা মহামারির কারণে বিয়ের অনুষ্ঠানের উপর সরকারি বিধিনিষেধ থাকায় ঘটকালি পেশায় অনেকটা ভাটা পড়েছে। ফলে সংসারের খরচ মেটাতে অনেক হিমশিম খেতে হয়েছে তাকে। এ সমস্যা মেটাতে বর্তমানে স্থানীয় কাটলাবাজারের তিনমাথা মোড়ে পিঠার দোকান বসিয়েছেন রাহিলা বিবি। এ দোকান চলে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। এখান থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসারের বাজারখরচ করে রাহিলা ফেরেন জীর্ণ কুঁড়ে ঘরে।
কাটলাবাজারটি সীমান্ত এলাকা হওয়ায় বিভিন্ন এলাকার মানুষ তার দোকানে এসে পিঠা কেনেন। বেশ মজা করে পিঠা খান ক্রেতারা। কেউবা পরিবারের জন্য পিঠা কিনে বাড়িতে নিয়ে যান।
রাহিলা বিবি আরও বলেন, আজ থেকে ১৫/২০ বছর আগেও যাদের নাড়ি কেটেছি তারা আজ অনেক বড় হয়েছে। তারাও আমার দোকানে পিঠা কিনতে আসে। তাদেরকে নিজের সন্তানের মতই মনে করি। তাদের নিকট পিঠার দাম চাইতে আমার বিবেকে বাধে। আমি তাদেরকে বিনামূল্যে পিঠা দেই। আমার নিজের হাতে বানানো পিঠা তাদেরকে খাইয়ে আত্মতৃপ্তি পাই।
স্বামীহারা এমন অসহায় একজন সংগ্রামী রাহিলা বিবি‘র কথা বলতে গিয়ে ২নং কাটলা ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মো. ইউনুছ আলী মন্ডল বলেন, আইলা আমাদের এলাকার অনেক পরিচিত মুখ। তিনি অনেক কষ্ট করে নিজে উপার্জন করে তার দুই ছেলেকে লালন—পালন করছেন এবং সেই সংসারের হাল এখনও ধরে রেখেছেন। তার এ জীবনসংগ্রাম সমাজের অন্যান্য নারীদের জন্য স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা ও অনন্য উদাহরণ। তাকে সরকারের পক্ষ থেকে সাধ্য অনুযায়ী সবধরণের সুযোগ—সুবিধা দেয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পরিমল কুমার সরকার বলেন, একজন অসহায় নারী হিসেবে তিনি সমাজের অনেক বাধা—বিপত্তি পেরিয়ে উঠে এসেছেন। তিনি নিঃসন্দেহে একজন জয়ীতা। তিনি যদি আগামীতে জয়ীতা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেন তাহলে সেটি উপজেলা প্রশাসন অবশ্যই উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে সেটি নিশ্চিত করা হবে।
ইউএনও আরও বলেন, সংগ্রামী নারীদের সবসময়ই জীবনমান উন্নয়নে বর্তমান সরকার সহযোগিতার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আমি তার সম্পর্কে এখন জানলাম। আগামীতে রাহিলা বিবি‘র জন্য সরকারি সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে।