প্রণোদনার টাকা গেল কোথায়?

পুরোটাই কি বড় ব্যবসায়ীদের পকেটে

203
দৈনিক তৃতীয় মাত্রা
দৈনিক তৃতীয় মাত্রা

করোনা সংক্রমণের পাক্কা দুই বছরের মাথায় জেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রণোদনার টাকা গেল কোথায়? সরকার ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখতে যে সোয়া লাখ কোটির বেশি টাকা প্রণোদনা হিসেবে ঘোষণা করেছে, তার ছিটেফোঁটাও তাঁরা পাননি। একজন ব্যবসায়ী ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, প্রণোদনার টাকা কে কাকে দিল, কখন দিল তাঁরা কিছু জানেন না। এ না জানার অর্থ হলো জেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা প্রণোদনার টাকা পাননি।

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) নেতাদের সঙ্গে আলোচনাকালে তাঁরা কর ও ভ্যাট আদায়ের নামে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের হয়রানি ও মামলা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাস মহামারিতে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন খাতে ২৩টি আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। প্রণোদনা প্যাকেজের মোট অর্থের পরিমাণ হলো ১ লাখ ২৮ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা।

জেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া গেল এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিনের কথায়ও। তিনি বলেছেন, সরকার টাকা দিচ্ছে, কিন্তু প্রকৃত ব্যবসায়ীরা পাচ্ছেন না। এটা একধরনের ষড়যন্ত্র। প্রণোদনার অর্থ নিয়ে ষড়যন্ত্র হলে সেটি এফবিসিসিআইয়ের পদাধিকারীদেরও জানার কথা। প্রণোদনার অর্থ গেছে ব্যাংকের মাধ্যমে। কোন ব্যাংক কাকে কত টাকা দিয়েছে, সেই হিসাব সরকারের কাছে আছে। তারপরও এফবিসিসিআই রহস্যজনকভাবে এ বিষয়ে এত দিন নিশ্চুপ ছিল।

এ কথা ঠিক যে করোনাকালে দেশের অর্থনীতিকে চাঙা রাখতে সরকারের দেওয়া প্রণোদনা অনেকটা ধন্বন্তরি ওষুধের মতো কাজ করছে। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পসহ অনেক খাতই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু শ্রমঘন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগের প্রণোদনা না পাওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অব ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার সংকট মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের টাকা পায়নি ৭২ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান; যাদের বেশির ভাগই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা। জরিপে অংশ নেওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র ১৯ শতাংশ প্রণোদনার অর্থ পেয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠান প্রণোদনার অর্থ বেশি পেলেও ৩০১টি ছোট প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৮ শতাংশ ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ এ সুবিধা পেয়েছে। গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের ৮৩ ভাগ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সরকার ঘোষিত প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত আছেন।

সরকার এ খাতের সহায়তায় ২৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু কাঠামোগত জটিলতার কারণে ব্যাংকগুলো এই প্যাকেজের আওতায় খুব কম ঋণই বিতরণ করেছে। প্রণোদনার ঋণের সুদের হার কম হওয়ায় ব্যাংকগুলো ছোট আকারের ঋণ দিতে উৎসাহ দেখায়নি। এ ছাড়া ঋণ নিতে যেসব কাগজপত্র দেখানো প্রয়োজন, অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পক্ষে তা সম্ভব হয়নি।

প্রণোদনা ও কর-ভ্যাটের বিষয়ে জেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া উচিত। এফবিসিসিআইকে কেবল ষড়যন্ত্রকারীদের খোঁজ না করে যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ব্যবসায়ীরা ঋণ পেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারকে আরও অনেক খাতের মতো তেলা মাথায় তেল দেওয়ার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে এসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প রক্ষায় সর্বাত্মক প্রয়াস নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ওপরই দেশের সিংহভাগ শ্রমজীবী মানুষ নির্ভরশীল।