পাইকগাছায় দৃষ্টিনন্দন ঢোল কলমি গাছ বিলুপ্তির পথে

86

ইমদাদুল হক, পাইকগাছা থেকে : ঢোল কলমি গাছ , দেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলেই একটি পরিচিত নাম। তবে কালের বিবর্তনে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় খুলনার পাইকগাছা উপজেলাতেও ঢোল কলমি বা বেড়াগাছ বিলুপ্তির পথে। গ্রামাঞ্চলে অনাদরে ও অবহেলায় বেড়ে ওঠা আগাছা হিসেবে পরিচিত বেড়ালতা বা ঢোল কলমি গাছ। মাত্র কয়েক বছর আগেও দেশের প্রায় প্রত্যেক এলাকায় রাস্তার ধারে, বাড়ির পাশে, মাঠে—ঘাটে, জলাশয়ের ধারে, খাল—বিল সর্বত্রই চোখে পড়তো এ গাছ। মূলত ঢোল কলমি গুল্ম প্রজাতির উদ্ভিদ।

এর কান্ড দিয়ে কাগজ তৈরি করা যায়। সবুজ পাতার গাছটি ছয় থেকে দশ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। তবে অযত্নে অবহেলায় জন্ম নেয়া ঢোলকলমি গাছের ফুল যেকোন বয়সি প্রকৃতি প্রেমিকের দৃষ্টি কাড়বে। পাঁচটি হালকা বেগুনি পাপড়ির কিছুটা মাইক আকৃতির ফুলটি দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। সারা বছরই ঢোল কলমির ফুল ফোটে। তবে বর্ষার শেষে শরৎ থেকে শীতে ঢোলকলমি ফুল বেশি দেখা যায়। আর একটি মঞ্জরিতে চার থেকে আটটি ফুল থাকে।

মধুর জন্য ফুলে আবার কালো ভোমরাও আসে। অযত্নে অবহেলায় জন্ম নেয়া ঢোল কলমি গাছ অল্পদিনের মধ্যেই ঘন ঝাড়ে পরিণত হয়ে জমির ক্ষয়রোধ করে ও সুন্দর ফুল দেয়। দেশের গ্রামাঞ্চলের ন্যায় ক’বছর আগেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এই গাছ জমির বেড়া হিসেবে ব্যবহার করা হতো। অনেক এলকায় স্বল্প হলেও তা এখনও কালের স্বাক্ষী হিসেবে রয়ে গিয়েছে। গ্রামাঞ্চলের গৃহ বধূরা এটিকে আবার জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করে থাকে।

নদীর তীরে কিংবা বিশাল ফসলের মাঠে ঢোল কলমি জন্মে পাখির বসার জায়গা করে দেয়। এ গাছে বসে পাখি পোকামাকড় খায়। এমনকি এর ফুলের মধু সংগ্রহ করতে ভোমরার আনাগোনাও চোখে পড়ে। গ্রামের শিশুরা ঢোলকলমির ফুল দিয়ে খেলা করে। মাত্র ক’বছর আগেও উপজেলার প্রায় অধিকাংশ ফসলের ক্ষেত, পুকুর ও বসতবাড়ির চারপাশে বেড়ার প্রধান উপকরণ হিসেবে এই ঢোল কলমির ব্যবহার হতো। কেউ কেউ কলমি গাছের সাথে নেট ও বাঁশের চটা ব্যবহার করে বেড়াকে শক্তিশালী করতো। ঢোল কলমির বীজ ও পাতায় তেতো স্বাদের সাদা কষ থাকায় এর পাতা গরু ছাগলে না খাওয়ায় বেড়া হিসেবে এটা ব্যবহারের চাহিদা বেশিই ছিল।

ঢোল কলমি খরা ও বন্যায় সহনীয় বলে প্রতিকুল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। সহজেই আবার কলমি গাছ মারা যায় না, খাল বিল ডোবা এবং খোলামেলা পরিবেশে এ গাছ খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে থাকে। তবে বর্তমানে কলমি গাছের সংকটে এর ব্যবহার আর তেমন চোখে পড়ে না। ঢোল কলমি গাছ বিলুপ্তির কারণ? গত ৯০ এর দশকে দেশজুড়ে ঢোল কলমি গাছ নিয়ে ভয়ংকর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই সময় গুজব রটে যে, ঢোলকলমি গাছে থাকা পোক এতটাই ভয়ংকর যে, এটা যেকোন মানুষকে কামড় দিলে মৃত্যু অবধারিত, এমন কি স্পর্শ লাগলেও জীবন বিপন্ন হতে পারে।

তৎকালীন সময়ে এ সংক্রান্ত খবর রেডিও, টিভি, পত্র—পত্রিকায় মহামারীর মৃত্যুর খবরের মত কবে কজন মরল কজন হাসপাতালে গেল সেরকম ভাবে প্রচারিত হয়েছিল প্রায় মাসজুড়ে। এর ফলে সারাদেশে সাধারণ মানুষ গণহারে, এমন কি স্থানীয় প্রশাসনও ঢোলকলমি গাছ কেটে নিধনের উদ্যোগ নিয়েছিল। এই বিদঘুটে নামের পোকাটি আমাদের দেশের বিভিন্ন এলাকায় যে ত্রাস সৃষ্টি করেছিলো তার জুড়ি মেলা ভার। এমনকি শুধু গ্রামেই নয় ঢোল কলমি গাছ পোকার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল খোদ ঢাকাতেও। এরপর এ গুজবের আতংক চরম পর্যায়ে পৌছালে টিভিতে একজন বিশেষজ্ঞ পোকাটি ধরে এনে নিজের হাতের উপর ছেড়ে দিয়ে হাটিয়ে, তারপর হাত দিয়ে পিষে মেরে দেখিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে এটি আসলে খুবই নিরীহ একটি কীট, মোটেও প্রাণ সংহারী নয়। এরপর থেকেই আতঙ্ক কেটে যায়।

তবে তার মধ্যেই দেশের অধিকাংশ এলাকার ঢোল কলমি গাছ প্রায়সব কেটে সাবাড় করা শেষ। এব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঢোল কলমি খুবই উপকারী গাছ। নদীতীর, খালপাড়ের মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখা, ভূমিক্ষয় রোধ, ভাঙনরোধে ঢোলকলমি গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঢোলকলমি ফুল সারা বছরই ফোটে। তবে বর্ষার শেষ ভাগ থেকে শরৎ—শীতে প্রস্ফুটন বেশি হয়ে থাকে। এই ঢোল কলমির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো গরু ছাগলে না খাওয়ায় এটা বেড়া হিসেবে ব্যবহার করা যায়। নদীতীর ভাঙন রক্ষা করে। এমনকি রান্নার কাজে জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।

তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে প্রাকৃতিক বেড়া হিসেবে বেশি পরিচিত এই ঢোল কলমি গাছ। তবে নানা কারণে এখন আর তেমন কলমি গাছ চোখে পড়ে না। স্থানীয় সচেতন মহল প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র সুরক্ষায় মূল্যবান এ উদ্ভিদকে সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে সকলেরই উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন।