পদ্মা সেতুর যত বিশ্ব রেকর্ড (ভিডিও)

283

স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন আর শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তবে রূপ পেয়েছে। আর এই স্বপ্ন পূরণে সবচেয়ে বড় অবদান যিনি রেখেছেন তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা।

পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ২৫ জুন, শনিবার পদ্মা সেতু উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরদিন রোববার ভোরে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় স্টিল ও কংক্রিটে তৈরি সুদীর্ঘ ৬.১৫ কিলোমিটার (২০,২০০ ফুট) দৈর্ঘ্য ও ৫৯.৬ ফুট প্রস্থের পদ্মা সেতু। বিস্ময়কর এই স্থাপনা শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, পুরো বিশ্বের কাছেই এক বিস্ময়। পদ্মা সেতু একটি-দুটি নয়, বেশ কয়েকটি বিশ্বেরেকর্ড গড়ে বিশ্বের মানচিত্রে উজ্জ্বল করেছে বাংলাদেশের নাম।

স্টিল ও কংক্রিটে তৈরি সুদীর্ঘ ৬.১৫ কিলোমিটার (২০,২০০ ফুট) দৈর্ঘ্য ও ৫৯.৬ ফুট প্রস্থের পদ্মা সেতু।

বিশ্বের সবচেয়ে খরস্রোতা নদীর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীর নাম। আর তারপরের অবস্থানটি হলো বাংলাদেশের পদ্মা নদীর। এমন খরস্রোতা ও গভীর নদীতে এত বিশাল সেতু নির্মাণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ।

খরস্রোতা পদ্মার বুকে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মিত হয়েছে। এতে সর্বমোট ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে পদ্মা সেতুর কাজ পুরোদমে শুরু হওয়ার আট বছর পর সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ২০২২ সালে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছে সারাবিশ্বের বিস্মের বিস্ময় পদ্মা সেতু।

অবিশ্বাস্য শোনালেও মাটির ১২০ থেকে ১২৭ মিটার পর্যন্ত গভীরে গিয়ে পাইল বসানো হয়েছে পদ্মা সেতু তৈরির জন্য। পৃথিবীর অন্য কোনো সেতু নির্মাণে এত গভীরে গিয়ে পাইল বসাতে হয়নি। এর মধ্য দিয়ে রীতিমতো বিশ্বরেকর্ড গড়েছে বাংলার গর্ব পদ্মা সেতু। বিশ্বের গভীরতম পাইলের রেকর্ড এখন পদ্মা সেতুর দখলে।

অবিশ্বাস্য শোনালেও মাটির ১২০ থেকে ১২৭ মিটার পর্যন্ত গভীরে গিয়ে পাইল বসানো হয়েছে পদ্মা সেতু তৈরির জন্য।

পদ্মা সেতুর আরেকটি বড় বিশ্বরেকর্ড হলো নদীশাসন। পদ্মা সেতুর জন্য সুদীর্ঘ ১৪ কিলোমিটার নদীশাসন করা হয়েছে। এমন নদী শাসনের নজির বিশ্বের আর কোথাও নেই। কাজেই নদীশাসনেও বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে আমাদের পদ্মা সেতু।

প্রচন্ড খরস্রোতা ও ভাঙনপ্রবণ পদ্মা নদী যাতে পদ্মা সেতুর ক্ষতি করতে না পারে মূলত সে কারণেই নদীশাসন করা হয়েছে। নদীশাসনের আওতায় আনা ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে ১.৬ কিলোমিটার মাওয়া প্রান্তে এবং বাকী ১২.৪ কিলোমিটার জাজিরা প্রান্তে। নদীশাসনে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার। মাদারীরপুরের শিবচর, শরীয়তপুরের জাজিরা এবং মুন্সিগঞ্জের মাওয়া- তিনটি জেলায় বিস্তৃত সমগ্র পদ্মা সেতু প্রকল্প।

পুরোবিশ্বের মধ্যে শুধু পদ্মা সেতুই নির্মিত হয়েছে কংক্রিট এবং স্টিল দিয়ে। বিশ্বে আর কোনো সেতু নির্মাণে কংক্রিট এবং স্টিল একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়নি।

এখন পর্যন্ত বিশ্বে যত সেতু নির্মিত হয়েছে সেগুলোতে হয় কংক্রিট, নাহয় স্টিল বা লোহা ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু পুরোবিশ্বের মধ্যে শুধু পদ্মা সেতুই নির্মিত হয়েছে কংক্রিট এবং স্টিল দিয়ে। পদ্মা সেতু নির্মাণে এই দুটি উপাদানই ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বে আর কোনো সেতু নির্মাণে কংক্রিট এবং স্টিল একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়নি। এদিক থেকেও বিশ্বরেকর্ড গড়েছে পদ্মা সেতু।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রেন ব্যবহার করা হয়েছে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রেন ব্যবহার করা হয়েছে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য। পদ্মা সেতুর পিলারের ওপর স্প্যান বসাতে যে ক্রেন ব্যবহার করা হয়েছে সেটি আনা হয় চীন থেকে। ক্রেনটির দাম আড়াই হাজার কোটি টাকা। তবে এত দাম দিয়ে না কিনে ক্রেনটি ভাড়া নেয় বাংলাদেশ সরকার। প্রতিমাসে ভাড়া দিতে হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। টানা সাড়ে তিন বছর কাজ করেছে এই ক্রেন। এতে মোট ব্যয় হয়েছে ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। পদ্মা সেতুর আগে বিশ্বের আর কোনো সেতু নির্মাণেই এত সুদীর্ঘ সময় ধরে ভাড়া খাটেনি ক্রেনটি।

রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও যাতে পদ্মা সেতু ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেভাবেই সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে এটি। অর্থাৎ রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হলেও বহাল তবিয়তে টিকে থাকবে আমাদের পদ্মা সেতু।

রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হলেও বহাল তবিয়তে টিকে থাকবে আমাদের পদ্মা সেতু।

ভূমিকম্প প্রতিরোধের জন্য পদ্মা সেতুর পিলার এবং স্প্যানের মধ্যে যে বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়েছে সেটাও একটা বিশ্বরেকর্ড। এত বড় বিয়ারিং এর আগে বিশ্বের আর কোথাও ব্যবহৃত হয়নি। এখানে সাড়ে ১০ হাজার মেট্রিক টন ওজনের একেকটি বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়েছে। পৃথিবীতে এর আগে কোনো সেতুতে এত বড় বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়নি।

লেখক : তানভীর খালেক