চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য ও কমিটি নিয়ে আবারও সংঘর্ষে ছাত্রলীগ

104
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য ও কমিটি নিয়ে আবারও সংঘর্ষে ছাত্রলীগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য ও কমিটি নিয়ে আবারও সংঘর্ষে ছাত্রলীগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তার ও কমিটির বিরোধে আবারও সংঘর্ষে জড়াল ছাত্রলীগ। দুই সদস্যের কমিটি ঘোষণার পর নিজেদের মধ্যে গত আড়াই বছরে ২৮ বার সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রলীগ। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে ক্যাম্পাসে দুই উপপক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১৩ কর্মী আহত হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবারের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

এবারের সংঘর্ষ উপপক্ষ বিজয় ও চুজ ফ্রেন্ডস উইথ কেয়ারের (সিএফসি) মধ্যে। সংঘর্ষ চলে প্রায় এক ঘণ্টা। পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও দায়ের কোপে আহত কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্র, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

বিজয়ের নেতা-কর্মীরা বলছেন, রাতের আঁধারে বিনা উসকানিতে তাঁদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে সিএফসির নেতা-কর্মীরা বলছেন, কয়েক দিন ধরে বিজয়ের নেতা-কর্মীরা ‘স্লেজিং’ করছেন। এ কারণে তাঁরা মঙ্গলবার রাতে ‘রিপ্লাই’ দিয়েছেন।

এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় ১৩ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার । ওই দিন ছাত্রলীগের কার্যক্রম দেখতে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির উপসংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক শেখ নাজমুল ইসলাম ও প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক হায়দার মোহাম্মদ। কমিটি পূর্ণাঙ্গের দাবিতে তাঁদের মূল ফটকেই আধা ঘণ্টা আটকে রাখেন বিভিন্ন উপপক্ষের কয়েক শ নেতা-কর্মী। সেখানে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর থেকে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতি দুই পক্ষে বিভক্ত। একটি পক্ষ সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন এবং আরেকটি পক্ষ শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত। এ দুই পক্ষ আবার ১১টি উপপক্ষে বিভক্ত। বিজয় ও সিএফসি উভয়ই মহিবুল হাসান চৌধুরীর অনুসারী। সিএফসির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সভাপতি রেজাউল হক। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন নেতৃত্ব দেন সিক্সটি নাইনের। তিনি আ জ ম নাছির উদ্দীনের সমর্থক। তবে কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় সিএফসি ও সিক্সটি নাইন ছাড়া অন্য উপপক্ষের নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ।

ছাত্রলীগের সংঘর্ষ ও কমিটি গঠনের বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সদস্যের কমিটিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আর সংঘর্ষের স্থায়ী সমাধান কীভাবে করা যায়, তা ভাবা হচ্ছে।
সংঘর্ষ-ভাঙচুরে আড়াই বছর পার

বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের জন্য দুই সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালের জুলাই। বলা হয়েছিল, দ্রুত সময়ের মধ্যে ২০১ সদস্যের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনটির কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দিতে হবে। কিন্তু কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেননি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। উল্টো ২০১৯ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ২৮ বার সংঘর্ষে জড়িয়েছেন ছাত্রলীগের বিভিন্ন উপপক্ষের নেতা-কর্মীরা।

চলতি মাসের মধ্যে কমিটি না হলে সংঘর্ষ ও মারামারির ঘটনা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিভিন্ন উপপক্ষের নেতা-কর্মীরা। কমিটি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে ভিএক্স উপপক্ষের নেতা প্রদীপ চক্রবর্তী বলেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কমিটি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করেছেন। সবার সামনে তাঁরা কমিটি পূর্ণাঙ্গের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। একই মন্তব্য করেন বিজয়ের নেতা ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইলিয়াছ।

জানতে চাইলে সভাপতি রেজাউল হক ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বলেন, চলতি মাসে কিংবা ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে। তাঁরা সব কটি উপপক্ষের কাছে নেতা-কর্মীর তালিকা চেয়েছিলেন। অনেকেই এখনো তালিকা জমা দেননি। এ কারণে কমিটি দিতে দেরি হচ্ছে।
তদন্ত কমিটি গঠন, এরপর?

মঙ্গলবারের সংঘর্ষের ঘটনায় করা তদন্ত কমিটি চার সদস্যের। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। গত আড়াই বছরে সংঘর্ষ-মারামারির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগেও ৯টি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এর মধ্যে প্রতিবেদন দিয়েছে দুটি। দুটি ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১২ কর্মীকে দুই মেয়াদে বহিষ্কার করে। অবশ্য বহিষ্কার করার পর মানবিক দিক বিবেচনায় সাতজনের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরে জড়িত কাউকে চিহ্নিত করতে পারেনি কমিটি। এ ছাড়া ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেও কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। কারও বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি সাংগঠনিক ব্যবস্থা।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শিরীণ আখতার বলেন, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে প্রক্টরিয়াল বডির আলোচনা চলছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে আগের কমিটির প্রতিবেদন না দেওয়ার বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।