Logo
সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ | ৪ঠা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

ত্রাণের জন্য রাস্তায় ভিড় রোহিঙ্গাদের

প্রকাশের সময়: ১২:০১ অপরাহ্ণ - শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৭

তৃতীয়মাত্রা :

রাখাইনে থামছে না সেনা ও বৌদ্ধদের বর্বরতা। গতকালও টেকনাফ থেকে মিয়ানমারের কয়েকটি স্থানে রোহিঙ্গা বসতিতে আগুনের ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। মৃত্যুর তাড়া খেয়ে এখনও বিভিন্ন সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে মানুষ। ঢুকছে বাংলাদেশে। পরিশ্রান্ত, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, অসহায়, নিঃস্ব রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে ছুটছে ত্রাণের আশায়। বাড়ছে ত্রাণ প্রবাহও। আরাকান সড়কের দু’পাশে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গারা প্রতিদিন একাধিকবার ত্রাণ পাচ্ছে। আবার সেই ত্রাণে স্থানীয়, অসাধু সিন্ডিকেট এবং পুরোনো রোহিঙ্গারাও ভাগ বসাচ্ছে। কিন্তু রাস্তা থেকে দূরে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গাদের অনেকেই ত্রাণের দেখা পাচ্ছে না। অবর্ণনীয় দুর্ভোগে অনাহারে দিন কাটছে তাদের অনেকের। ফলে ভেতরের দিকে থাকা রোহিঙ্গারাও এখন রাস্তায় ছুটছে। ত্রাণের আশায় আরাকান সড়কের দু’পাশে ভিড় জমাচ্ছে। ত্রাণবঞ্চিত রোহিঙ্গাদের এ প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। বিতরণের স্থান নির্ধারিত থাকলেও থামছে না বিশৃঙ্খলা। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা শরণার্থীদের সেবায় কাজ শুরুর পর থেকে পরিস্থিতির উন্নতি ও সমন্বয়হীনতা কাটছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
১৯৯২ সালে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে আসেন হোছাইন। তিনি একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার হয়ে শরণার্থীদের সেবায় কাজ করছেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা প্রাণ নিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার পর যে যেখানে পেরেছে তাঁবু খাটিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। রাস্তা থেকে যারা দূরে অবস্থান নিয়েছে তাদের অনেকেই এখনও ত্রাণ পাচ্ছে না। এখন তারাও রাস্তায় এসে ভিড় জমাচ্ছে। তবে গত দু-একদিন ধরে ত্রাণ বিতরণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে সেনা সদস্যদের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। এরপর থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে ত্রাণ ও শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজে সেনাবাহিনীর তৎপরতা শুরু হলেও পরিস্থিতির বিচারে তা এখনও যথেষ্ট ব্যাপকতা পায়নি। টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্পে কিছু সেনা সদস্য কাজ শুরু করেছেন। কানজারপাড়া, উনচিপ্রাংয়ে এখনও কাজ শুরু হয়নি। আবার উখিয়া সদরের পর থেকে টেকনাফ সদর পর্যন্ত প্রায় স্টেশনে এবং রাস্তায় রাস্তায় ত্রাণের জন্য রোহিঙ্গাদের ভিড় করতে দেখা গেছে।
কুতুপালং নিবন্ধিত ক্যাম্পের ডি-ব্লকের পশ্চিমে অবস্থান নিয়েছেন মোস্তাক আহমদের পরিবার। এক স্থানীয়ের সঙ্গে ১ হাজার টাকা অগ্রিম ও প্রতি মাসে ২০০ টাকা ভাড়ার চুক্তিতে মিলে সেই আশ্রয়। তিনি গত এক সপ্তাহ ধরে কোনো ত্রাণ পাননি। জুটেনি ত্রাণের খাবারও। ফলে বাধ্য হয়ে সেখানে অবস্থান নেয়া লোকজন গত কয়েকদিন ধরে রাস্তায় ভিড় করছে বলে জানান তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা। আরাকান সড়ক থেকেই মিয়ানমারে ৩টি স্থানে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। একাধিক রোহিঙ্গা ও স্থানীয়ের কাছে এর সূত্রপাত ও অবস্থান সম্পর্কে তাদের ধারণা জানতে চাইলে বলেন, রাখাইনের সীমান্তের কাছে নাইনসং ও মাঙ্গালাসহ কয়েকটি গ্রামে সেনা ও বৌদ্ধরা মুসলিম রোহিঙ্গাদের অবশিষ্ট ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। প্রায় ঘরবাড়ি তো আগেই পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। গত ২৫শে আগস্ট থেকে রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রতি সেনা ও বৌদ্ধদের অব্যাহত নৃশংসতা গত ২৭ দিন ধরে চলছে। এখনও প্রাণ নিয়ে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, উখিয়ার আঞ্জুমান সীমান্তসহ নানা পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। আর একটু ত্রাণের জন্য রাস্তায় ভিড় করছে নতুন আসা এই রোহিঙ্গারা। সহজে ত্রাণ পেতে নতুন আসা অনেক রোহিঙ্গা আরাকান সড়কের পাশে এবং সড়ক সংলগ্ন সমতল বা পাহাড়ে তাঁবু টানানোর প্রতিযোগিতা করছে।
গতকাল দুপুর ১টা। টেকনাফের কানজরপাড়া। আরাকান সড়কের দু-পাশে অবস্থান নিয়েছেন কয়েক শ নারী-পুরুষ। সেই সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা আসার সংখ্যা কমে আসলেও এত মানুষের অবস্থান দেখে কৌতূহল জাগে। খোঁজ নেয়া হয়। একটি গাড়ি কাছে আসতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ সবাই। এক লোক সামনের আসন থেকে নগদ টাকা ও পেছনের আসন থেকে অপর এক ব্যক্তি খাবার প্যাকেট ও অন্যজন দেশলাই বিতরণ করছিলেন। কাড়াকাড়ি-হুড়োহুড়ির মধ্যে কেউ পেয়েছে তো কেউ পায়নি। এরপর গাড়িটির গতি বাড়লে তারা পিছে পড়ে যান।
ত্রাণের জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করেও ব্যর্থ হন ছফুরা। পরে তার দিকে একটি দেয়াশলাই ছোঁড়ে মারা হয়। তা-ই কুড়িয়ে নেন তিনি। তিনি রাস্তার পরে ধানক্ষেত পেরিয়ে এক পাড়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে ত্রাণ না পৌঁছার কারণে তিনি ত্রাণের জন্য রাস্তায় এসে ভিড় করেছেন বলে জানিয়েছেন।
রাথেডংয়ের শিলখালী থেকে আসা ছফুরা বলেন, তাঁবুতে ৪ মেয়ে ২ ছেলে। স্বামী এখনও নিখোঁজ। এক লোক জায়গা দিয়েছে। তাতে তাঁবু খাটিয়েছি। এই সীমান্ত দিয়ে ঢোকার পর মানুষের কিছু ত্রাণ পেয়েছিলাম। কিন্তু আশ্রয়টা রাস্তা থেকে দূরে হওয়ায় আর ত্রাণ জুটেনি। সেখানে ত্রাণ নিয়ে কেউ যায় না। স্থানীয়রা মাঝে মধ্যে দু-একবেলা খেতে দেয়। অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হচ্ছে। তাই গত তিনদিন ধরে রাস্তার পাশে অবস্থান নিয়েছি। ত্রাণও পাচ্ছি না।
একই চিত্র দেখা গেছে টেনাফের নয়াপাড়া, উনচিপ্রাং, বুলুবুনিয়া, হোয়াইক্যংয়েও। তাঁবুর আশ্রয় ছেড়ে ত্রাণের আশায় রাস্তার দু’পাশে আশ্রয় নিয়েছে শত শত মানুষ। স্টেশনগুলোতে মানুষ আর মানুষ। গাড়ি ঢুকতেই তাদের দৌড়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে যানজট। দুর্ভোগে পড়ছেন পথচারীরা। গতকাল ত্রাণের জন্য দৌড়াতে গিয়ে অপর একটি যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আক্কাস নামে এক রোহিঙ্গা কিশোরের মাথা ফেটে গেছে।
কানজরপাড়ার বাসিন্দা মালয়েশিয়া প্রবাসী জসিম উদ্দিনের স্ত্রী হুসনে আরা। তিনি প্রায় প্রতিদিন সেই পথ দিয়ে আসা বহু রোহিঙ্গাকে তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন। পরে সেখান থেকে তারা অনেকেই নয়াপাড়া ও কুতুপালং ক্যাম্পের দিকে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু আগে আসা রোহিঙ্গারা প্রায়ই আশ্রয় নিয়েছে রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে ক্যাম্পের ভেতরের দিকের পাহাড় ও সমতলে।
তিনি বলেন, বহু লোক মিয়ানমার থেকে পার হওয়ার পর আমাদের ও প্রতিবেশীদের ঘরে দু-এক রাতের জন্য আশ্রয় নিচ্ছে। প্রথম দিকে যারা আশ্রয় নেয় তারা ক্যাম্পের দিকে চলে গেলেও নতুন আসা রোহিঙ্গাদের ত্রাণ পাওয়ার জন্য রাস্তার পাশে বসে পড়ছে।
ত্রাণের জন্য টেকনাফের উলুবুনিয়ায় রাস্তায় ভিড় করতে দেখা গেছে রোহিঙ্গা ছমুদা, কলিমন, লাতু, লালচানসহ শতাধিক নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ। তারা অভিযোগ করেন, তালিকায় এখনও আমাদের নাম উঠেনি। ত্রাণও পাচ্ছি না। অপর দিকে রাস্তায় আসলেই ত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। তাই এখানে এসেছি। কেউ যদি দয়া করে কিছু খাবার দেয় সে আশায় বসে আছি।
তাদের সঙ্গে থাকা রোহিঙ্গা যুবতী শারেকা বোরকা পরা অপর কিছু নারীর দিকে ইঙ্গিত করে অভিযোগের সুরে বললেন, আমরা তো পেটের দায়ে রাস্তায় ভিড় করছি। আর এরা। তারা তো বাংলাদেশি। ওই গ্রাম থেকে এসে গতকালও আমাদের ত্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আবার আমাদেরকে গালিগালাজ করে। ভেতরে শৃঙ্খলার সঙ্গে সবাইকে ত্রাণ দিলে কেউ আর রাস্তায় ভিড় কববে না বলেও মন্তব্য তার।
অপর এক রোহিঙ্গা সুলতান নূর বললেন, আমার ঘরে বস্তায় বস্তায় চাল ছিল। গোলাভরা ধান ছিল। এমন হবে তা কোনদিন ভাবতে পারিনি। মগেরা আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে। এখন পথে বসতে হয়েছে। খেতে পারলে কেউ ত্রাণের জন্য রাস্তায় এসে জীবন দেবে না।

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
Read previous post:
প্রবাসেই ভোটার হবেন প্রবাসীরা

তৃতীয়মাত্রা: প্রবাসী বাঙালিদের ভোটার হওয়ার জন্য এখন থেকে আর দেশে আসার দরকার হবে না। প্রবাসে বসেই বাংলাদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে নির্বাচন...

Close

উপরে