Logo
শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

বৃদ্ধাশ্রমই এখন শেষ ঠিকানা হলো তাদের

প্রকাশের সময়: ৩:৩০ অপরাহ্ণ - শনিবার | আগস্ট ১১, ২০১৮

তৃতীয় মাত্রা :

ফরহাদ আকন্দ, গাইবান্ধা প্রতিনিধি : গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার শিববাড়ী ইউনিয়ের বোয়ালিয়া গ্রামে অসহায় মানুষ নিয়ে গড়ে ওঠা বৃদ্ধ সেবা বৃদ্ধাশ্রমে। এই বৃদ্ধাশ্রমে থাকা অনেকেরই ছেলে-মেয়ে নেই। আবার কারও ছেলে-মেয়ে থাকলেও খোঁজ-খবর নেয়না তাদের বৃদ্ধ পিতা-মাতার। ফলে তাদের বৃদ্ধ বয়সে এই দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্য তারা শেষ আশ্রয় হয়ে উঠেছে ‘বৃদ্ধ সেবা বৃদ্ধাশ্রম’।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার স্থানীয় ১২ তরুণ নিজেদের উদ্যোগে শিববাড়ী ইউনিয়ের বোয়ালিয়া গ্রামে ২০১৭ সালে গড়ে তুলেছেন ‘বৃদ্ধা সেবা বৃদ্ধাশ্রম’। এরই মধ্যে এখানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন ১৯ জন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা কমিটির ১২ জনের মধ্যে ৯ জনই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। আর তিনজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ি।
বৃদ্ধাশ্রম সূত্রে জানা যায়, প্রতি মাসে এসব অসহায় মানুষদের খাওয়ার জন্য চাল লাগে সাড়ে ১১ হাজার টাকার, ওষুধ ৭ হাজার টাকার, রান্নার জন্য খড়ি লাগে ১ হাজার ৮০০ টাকার, বৃদ্ধাশ্রমের বাসা ভাড়া ৬ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিল ১ হাজার টাকা ও কাঁচা বাজারসহ অন্যান্য উপকরণ বাবদ ব্যয় হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। এছাড়া তাদের খাবার রান্না করা, যতœ নেওয়ার জন্য রয়েছেন তিনজন মহিলা ও একজন নাইটগাড। তাদেরকে প্রতিমাসে ১০ হাজার ২০০ টাকা। দিতে হয়। এরমধ্যে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আসে বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা কমিটি থেকে এবং বাকী টাকা আসে বিভিন্ন মানুষের সাহায্য থেকে। এদের মধ্যে ৭ জন রয়েছেন উপদেষ্টা কমিটিতে। এ ছাড়া ৩০ জন রয়েছেন যারা প্রতিমাসে টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেন বৃদ্ধাশ্রমকে। এসব অসহায় মানুষদের ভালোভাবে জীবন-যাপনের জন্য প্রতিমাসে প্রয়োজন হয় ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তা ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে সম্পন্ন করতে হচ্ছে। প্রতিদিন অসহায় মানুষেরা আসেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকার জন্য। কিন্তু টাকার অভাবে তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে দিতে পারছেন না বলে জানান বৃদ্ধ সেবা বৃদ্ধাশ্রমের উদ্যোক্তা ও সভাপতি আপেল মাহমুদ।
বৃদ্ধ সেবা বৃদ্ধাশ্রমের উদ্যোক্তা আপেল মাহমুদের বাড়ী গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের ছোট সোহাগী গ্রামে। বাবা মোকছেদ আলী কৃষি কাজ করেন ও মা রেহেনা বেগম গৃহিনী। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। আপেল মাহমুদ বগুড়া আজিজুল হক কলেজে সম্মান তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।
বৃদ্ধাশ্রমে থাকা কাজবান বেওয়া বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর আমাকে বাড়ী থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর আমি বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতাম। অন্যের কাছে চেয়ে নিয়ে খেয়েছি।
কাজবান বেওয়ার মতো এই বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই হয়েছে একাত্তর বছরের পাকিজা বেওয়ার। তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনছেন এখানে। গোবিন্দগঞ্জের তরুণীপাড়ার এই বদ্ধৃা জানান, স্বামীর ছোট ব্যবসার আয়ে চলতো সংসার। নিজেরা খেয়ে না খেয়ে একমাত্র ছেলের মুখে তুলে দিয়েছেন খাবার। অথচ স্বামী মারা যাওয়ার সেই ছেলের বোঝা হন তিনি। একমাত্র ছেলে ও ছেলের বউ তাকে তাড়িয়ে দেওয়ায় বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে হয়েছে।
গোবিন্দগঞ্জ পৌর এলাকার কালকাডোবা গ্রামের ৮৩ বছর বয়সী জবেদ আলী। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। এদের মধ্যে এক ছেলে ঢাকায় শ্রমিকের কাজ করেন ও অপরজন এলাকায় ভ্যান চালান এবং মেয়ে বিবাহিত। ছেলেরা বাবা-মায়ের দেখাশোনা করেন না। ঠিকমতো খেতে দিতেন না। যার কারণে এই বৃদ্ধ বয়সে খেয়ে না খেয়ে বাড়ীতে থাকতে হতো জবেদ আলীকে। পরে তার শেষ আশ্রয় হয় এই বৃদ্ধাশ্রমে। আরেক বৃদ্ধা পলাশবাড়ীর হরিনামারীর মেহেরুণ নেছা। দুই ছেলে-এক মেয়ে নিয়ে তার সাজানো সংসার ছিল। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। দুই ছেলে বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছেন। নিজের বাড়িতে জায়গা না হওয়ায় মনের দুঃখে আত্মহত্যা করতে চেয়েও পারেননি মেহেরুণ নেছা। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে রেখে যান এই বৃদ্ধাশ্রমে। গত এক বছরে একবারও খোঁজ নেয়নি ছেলেমেয়েরা।
শুধু কাজবান বেওয়া, পাকিজা বেওয়া, জবেদ আলী আর মেহেরুণ নেছাই নয়, তাদের মতো আরও ১৯ জন অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হয়েছে স্থানীয় তরুণদের প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা এ বৃদ্ধাশ্রমে। এই ১৯ জনের মধ্যে কেউ দরিদ্র-অসহায়, কেউ ভূমহীন, কেউ বা সন্তানের অবহেলা-অপমানের শিকার।
বৃদ্ধাশ্রমটি প্রতিষ্ঠার কারণ জানতে চাইলে আপেল মাহমুদ বলেন, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের ছোট সোহাগী গ্রামের এক বাড়ীতে থাকতেন ভ‚মিহীন নিঃসন্তান মোফাজ্জল হোসেন ও তার স্ত্রী আজিরন বেগম। ২২ বছর আগে মোফাজ্জল হোসেন মারা গেলে আজিরন বেগম একা হয়ে যান। তিনি দিন দিন অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। একসময় চলাফেরা করতে না পেরে বিছানায় মলমুত্র ত্যাগ করতেন। কিন্তু তার দেখভাল করার মতো কেউ ছিল না। পরে সে বাড়ী থেকে তাকে বের করে দেওয়া হলে তিনি পথে পথে ঘুরে বেড়ান। আজিরন বেগম দীর্ঘদিন কষ্ট ভোগ করে ১৩ মাস আগে পথেই মারা যান। তার এ কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখে আমার ভীষণ মায়া হয়। এরপর একটি বৃদ্ধাশ্রম চালু করার উদ্যোগ নেই।
শহিদুল ইসলাম খোকন ও মো. শামসুজ্জোহা মোল্লাকে সাথে নিয়ে আলোচনা করি। পরে একটি কমিটি গঠনের পর বৃদ্ধাশ্রমটি চালু করি। প্রথম দিকে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত টাকায় বৃদ্ধাশ্রমটি চালানো হলেও পরে অসহায় মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যয়ভার বহন করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে বৃদ্ধ সেবা বৃদ্ধাশ্রম চলছে আমাদের ১২ জনের ব্যক্তিগত টাকা ও বিভিন্ন মানুষের কাছে থেকে পাওয়া সাহায্য নিয়ে। বৃদ্ধাশ্রমের এসব অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ও দানশীল মানুষদের সহযোগিতা চেয়েছেন আপেল মাহমুদ।

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
Read previous post:
সাতক্ষীরায় ইয়াবাসহ ৫০ জন আটক

তৃতীয় মাত্রা : শেখ আমিনুর হোসেন,সাতক্ষীরা ব্যুরো চীফঃ সাতক্ষীরায় পুলিশের মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযানে ২৪ পিস ইয়াবা উদ্ধারের সাথে দুই...

Close

উপরে