Logo
মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০২১ | ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

আজ গুরুদাসপুর গণহত্যা দিবস

প্রকাশের সময়: ২:০২ অপরাহ্ণ - রবিবার | এপ্রিল ১৬, ২০১৭
Uncategorized |

তৃতীয় মাত্রাঃ
ওয়াদুদ রতন, গুরুদাসপুর, নাটোর:
আজ সোমবার, ১৭ এপ্রিল। পাক হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের এইদিনে এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় গুরুদাসপুরের নারি বাড়ী মহল্লায়। আজ গুরুদাসপুরে গণহত্যাদিবস, অযতœ অবহেলায় গণকবর, আজো স্বীকৃতি পায়নি সেদিনের শহীদরা।
দেশ ব্যাপি স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘনঘটা। মুক্তিকামি মানুষ লড়ছেন পাক সেনাদের সাথে। কিন্তু তখনও যুদ্ধের প্রস্তুতি নেই গুরুদাসপুরে। এখানকার মানুষ বিবিসির সংবাদ শুনে শুনে যুদ্ধটাকে বোঝার চেষ্টা করছে। সচেতন টগবগে কিছু তরুন। অনেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাড়ি ছেড়েছেন অনেক আগেই। সেটা ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিলের কথা। দুপুর সাড়ে ১২টা ছুঁই ছুঁই করছে। মাথার উপর বৈশাখী সূর্যের উত্তাপ। এলাকার ১৮ জন শিক্ষিত, আধা শিক্ষিত, অশিক্ষিত মানুষ একটি গাছের ছায়ায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেশের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে খোশ গল্পে মেথে উঠেছেন। তাদের মনে পাকসেনা ভীতি ছিল না তখনও। কারন গুরুদাসপুর উপজেলাটি ছিল যোগাযোগ ব্যাবস্থায় পশ্চাদপদ। কিন্তু না। কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই পাকসেনাদের বহনকারী একটি গাড়ি ঢুকে পড়ে গুরুদাসপুরে। পথে একসাথে এত গুলো মানুষের অবস্থান দেখে তাদের ঘিরে ধরে এবং একসঙ্গে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে গুলি চালায় পাক বাহিনি। ঘটনাস্থলে ১৬ জন যুবক নিহত হয়। ভাগ্যক্রমে বেচে যান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ ও সুনিল কুমার গুহ। বেঁচে যাওয়া সুনীল গুহই সেই দিনের সেই গণহত্যার গল্প শোনাতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। এই গণহত্যাটি ঘটে গুরুদাসপুর পৌর শহর সংলগ্ন নাড়িবাড়ি মহল্লার হিন্দু পাড়ায়। বর্তমান ব্র্যাক অফিসের সামনের রাস্তায়। ওই ঘটনায় নিহতরা হলেন, ০১. শিতা নাথ হালদার, ০২. বলরাম হালদার, ০৩. নীল রতন সরকার, ০৪. নবরাম মজুমদার, ০৫. ড.মনিন্দ্র নাথ গুহ, ০৬. দীলিপ কুমার সরকার, ০৭. সুরেশ চন্দ্র মালাকার, ০৮. মানিক চন্দ্র মালাকার, ০৯. বিষ্ট পদ ঘোষ, ১০. সুধির চন্দ্র হালদার ওরফে কেরা হালদার, ১১.  সুবোদ চন্দ্র হালদার, ১২. যদুনাথ কর্মকার, ১৩. দুখুরাম হালদার, ১৪. দুলাল মালাকার, ১৫. গেদু মালাকার, ১৬. বাদল চৌধুরী। প্রত্যক্ষদর্শি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সুত্রে জানা যায়, পাকবাহিনী তাদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি। ক্ষতি গ্রস্থ পরিবার গুলো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্মিভূত করে দিয়ে চলে যান। তারপর থেকেই পরিবার গুলো পথে বসেছে। দেয়া হয়নি এসব পরিবারকে শহীদদের মর্যাদা। পায়না সরকারি তেমন কোন অনুদান। বছরের পর বছর পরিবার গুলো চরম অমানবিক জীবন যাপন করছে। শুধু তাই না, দেশের কারনে জীবন যাওয়া এসব শহীদদের গণ কবর গুলো পড়ে আছে অযতেœ-অবহেলায়। এমনকি নিজস্ব ভাবে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ গুলোও দখল হয়ে গেছে। ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে সেগুলোও। শহীদ বিষ্ট পদ ঘোষের স্ত্রী সূনীতি ঘোষ এই বয়সেও ক্ষেত খামারে ১০০/১৫০ টাকা দিন মজুরীতে কাজ করে সংসার চালায়। তার দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে কৃষ্ণ পদ ঘোষ প্রতিবন্ধী। কিন্তু ওই প্রতিবন্ধি ছেলে তার জীবন-জীবিকার তাগিদে অটো রিকসা চালিয়ে ছেলে মেয়ে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ছোট ছেলে বলরাম ঘোষ ছাইকেল মেকার থেকে এখন অটো রিকশা চালক। সূনীতি ঘোষ জানান, শেখ মুজিব বেঁচে থাকতে মাঝে মাঝে কিছু সাহায্য পেলেও বর্তমানে তেমন কেউ খোঁজ খবর রাখে না। ইতি পূর্বে মুক্তিযোদ্ধা সংসদে ধরনা ধরে পেয়েছেন শুধু একটা মেডেল ও একটা ব্যাচ। কিন্তু শহীদ পরিবার হিসেবে পরিচয় দেবে এমন কোন কাগজ তিনি পাননি। শহীদ সুরেশ চন্দ্র মালাকারের ছেলে সুবল চন্দ্র মালাকার। সেই দিনে বিধাতা তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন তার বাবা সহ দোতলা বাড়ি আর বাড়ির ভেতরে রক্ষিত সমস্ত সম্পদ, একই দিনে তার ভগ্নীপতি কার্ত্তীক মালাকার নাটোরের বর্তমান জয়কালিবাড়ির কাছে পাক বাহিনীর হাতে শহীদ হন। তখন থেকে তার বোন মীরা মালাকার ভাইয়ের গৃহেই বাস। তিনিও শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে বর্তমানে সরকারি ভাবে কোন সহযোগীতা পায়নি। তার ছেলে উত্তম মালাকার এইচএসসি পাশ করে কোন চাকরী না পেয়ে বর্তমানে একটি কিন্ডার গার্টেনে শিক্ষকতা ও কয়েকটি টিউশনি করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন। শহীদ সুরেশ চন্দ্র মালাকারের পুত্র সুবল চন্দ্র মালাকার বলেন, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতে বিভিন্ন জাতীয় উৎসবে তাদের ডাকা হত এবং তার মৃত্যুর পরে ২০০৯ সালের ২৬ নভেম্বরে একটি অনুষ্ঠানে শেষ বারের মত তাকে দাওয়াত করা হয়। তার পর বর্তমানে আর কেউ কোন খোঁজ খবর নেন না। ওই দিনের শহীদ সুধির ওরফে কেরা হালদারের সন্তান সন্তান রবি হালদার পৌর গেটে মান্নানের চা’য়ের দোকানে চাকুরী আর তার স্ত্রী রাজমিস্ত্রি’র কাজ করে জিবীকা নির্বাহ করছেন। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো জানায়, তৎকালিন সময়ে শহীদ পরিবার গুলোর নিজস্ব অর্থে ওই সকল শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনার তৈরী করলেও কোন দিনই তা সরকারি ভাবে রক্ষনা বেক্ষনের কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অথচ ওই শহীদ মিনার গুলো সে সময়ের শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের একমাত্র মিনার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
যোগাযোগ করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনির হোসেন গণকবরগুলোর দৈন্যদশার জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবেমাত্র এসেছি, ওই সকল পরিবার গুলোর সরকারি সহযোগিতার বিষয় দেখা হবে।
এব্যাপারে গুরুদাসপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা কমান্ডার মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেন, সম্মুখযুদ্ধে যারা মারা গেছেন শুধু তাদের নাম শহীদদের তালিকায় এসেছে। আপাততঃ ওই সকল শহীদদের নিয়ে কোন তালিকা হবার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছেনা। তবে, যেহেতু তারা দেশের কারনে পাক-বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন সেহেতু তাদের নাম শহীদের তালিকায় থাকা উচিত।
আগামীতে তাদের নাম শহীদের তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করার জন্য উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জোড় দাবি জানান তিনি।

Read previous post:
লক্ষ্মীছড়িতে স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করে স্বামীর আত্মহত্যা

তৃতীয় মাত্রাঃ তালাত মাহমুদ শিশির, লক্ষ্মীছড়ি : খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায় বিজুর দিনে সারা রাত বাহিরে কাটিয়ে মদ্যপ অবস্থায় সকালে...

Close

উপরে