Logo
বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২১ | ১২ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সাতক্ষীরায় পানিফল চাষ, অধিক লাভের স্বপ্ন দেখছেন কৃষক

প্রকাশের সময়: ২:৩২ অপরাহ্ণ - সোমবার | অক্টোবর ১১, ২০২১

তৃতীয় মাত্রা

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : পানি ফল বা পানি সিংড়া সম্ভাবনাময় চাষ হিসাবে দেখা দিয়েছে। আর তাই এ চাষ করে কৃষক ব্যাপক লাভের আশায় স্বপ্ন দেখছেন।

কৃষি বিভাগ ও ইন্টারনেট থেকে পাওয়া তথ্য মতে, পানিফল একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল। এর ইংরেজি নাম Water chestnut এবং উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Trapa bispinosa। পানি ফলের আদিনিবাস ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা হলেও এর প্রথম দেখা পাওয়া যায় উত্তর আমেরিকায়। বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় পানি ফলের বাণিজ্যিক ভাবে চাষ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। পানিফল একটি বর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। জলাশয় ও বিল-ঝিলে এ ফলটি জন্মে। এর শেকড় থাকে পানির নিচে মাটিতে এবং পাতা পানির উপর ভাসতে থাকে। এক একটি গাছ প্রায় পাঁচ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পানি ফলের আরেক নাম ‘সিংড়া’।

ফলচাষ শুরু হয় ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এবং ফল সংগ্রহ করা হয় অগ্রহায়ন-পৌষ মাসে। পানিফল কচি অবস্থায় লাল, পরে সবুজ এবং পরিপক্ক হলে কালো রং ধারন করে। ফলটির পুরু নরম খোসা ছাড়ালেই পাওয়া যায় হৃৎপিন্ডাকার বা ত্রিভুজাকৃতির নরম সাদা শাসঁ। কাঁচা ফলের নরম শাসঁ খেতে বেশ সুস্বাদু। প্রতি ১০০ গ্রাম পানিফলে ৮৪.৯ গ্রাম পানি, ০.৯ গ্রাম খনিজ পদার্থ, ২.৫ গ্রাম আমিষ, ০.৯ গ্রাম চর্বি, ১১.৭ গ্রাম শর্করা, ১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.৮ মিলিগ্রাম লৌহ, ০.১১ মিলি গ্রাম ভিটামিন বি-১, ০.০৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২ ও ১৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। তাছাড়া এ ফলে ৬৫ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি থাকে। পানিফলে পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম রয়েছে। দেহের প্রয়োজনীয় খনিজ লবণগুলোর মধ্যে ক্যালসিয়াম অন্যতম। ফসফরাসের সহযোগিতায় শরীরের হাড় ও দাঁতের গঠন এবং মজবুত করা ক্যালসিয়ামের প্রধান কাজ। লৌহ অত্যন্ত জরুরি একটি খনিজ লবন। লৌহের অভাবে মানবদেহে অপুষ্টিজনিত রক্তশূণ্যতা দেখা দেয়। ছোট ছেলেমেয়েরা এবং গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েরা অতি সহজে রোগের শিকার হয়। পানি ফলে যথেষ্ট পরিমাণে লৌহ পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম পানি ফলে ভিটামিন ‘সি’ এর পরিমান ১৫ মিলিগ্রাম আর শসাতে আছে ভিটামিন ‘সি’ মাত্র ৫ মিলিগ্রাম । ভিটামিন ‘সি’ শরীরে চামড়া, দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্য রক্ষায় অপরিহার্য। তাছাড়া ভিটামিন ‘সি’ অস্ত্রে লৌহ শোষণে সাহায্য করে। বাংলাদেশের শতকরা ৯৩ ভাগ পরিবার ভিটামিন ‘সি’ এর অভাবে ভুগছে। খাদ্যে ভিটামিন ‘সি’ এর ঘাটতি বিবেচনা করে এ ফলের প্রতি আমাদের অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পানি ফল কাঁচা খাওয়া হয়, তবে সিদ্ধ করেও খাওয়া যায়। কাঁচা পানিফল বলকারক দুর্বল ও অসুস্থ মানুষের জন্য সহজপাচ্য খাবার। ফলের শুকনো শাঁস রুটি করে খেলে এলার্জি ও হাত-পা ফোলা রোগ উপশম হয়। পিওপ্রদাহ, উদরাময় ও তলপেটের ব্যথ্যা উপশমে পানিফল খাওয়ায় প্রচলন রয়েছে। বিছাপোকা কামড়ের যন্ত্রনায় থেঁতলানো কাঁচা ফলের প্রলেপ দিলে উপকার পাওয়া যায়। পানিফল খুব লাভজনক একটি ফসল। এর উৎপাদন খরচ খুব কম। সাতক্ষীরা জেলার সদর, কলারোয়া, দেবহাটা, কালিগঞ্জ, আশাশুনি, সদরের আংশিক ও শ্যামনগর উপজেলায় জলাবদ্ধ এলাকার চাষিরা পানিফল চাষ করে অধিক লাভবান হচ্ছেন। ফলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ ফলের চাষ। সেই সাথে বাড়ছে ফলটির জনপ্রিয়তা।

সুস্বাদু ও পুষ্টিকর এ ফল সারা দেশে ফল হিসেবে পরিচিতি না থাকলেও দিনে দিনে এর চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। পানি চাষ লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছর দেবহাটাসহ সাতক্ষীরা জেলার চাষীরা আগ্রহী হয়ে উঠেছে। মৌসুমে ফল হিসেবে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলাতে ব্যাপক পরিমান চাষ হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের হিসাবে গতবছর যেখানে চাষের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৮/২০ হেক্টর জমিতে হেক্টর প্রতি ৩০ মেট্রিকটন এবছর ১৬ মেট্রিকটন যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্র ছাড়িয়ে দ্বিগুন ছাড়িয়েছে। এবছর ২০/২২ হেক্টর জমিতে পানি ফলের চাষ হয়েছে। বিগত বছরের তুলনায় জেলার সব উপজেলার পাশাপাশি দেবহাটা উপজেলার সখিপুর, গাজিরহাট, কামটা, কোঁড়া, দেবহাটা, পারুলিয়া, কুলিয়া, বহেরাসহ বিভিন্ন এলাকায় চাষ করা হয়েছে। এ চাষ ফসল চাষের জমি, ডোবা, খানা, মৎস্য ঘেরে সুবিধা জনক। সামান্য লবনাক্ত ও মিষ্টি পানিতে চাষ করার সুযোগ থাকায় দিনে দিনে চাষের পরিধি বেড়ে চলেছে। তাছাড়া পানি ফল গাছ দেখতে কচুড়িপানার মত পানির উপরে ভেসে থাকে, পাতার গোড়া থেকে শিকড়ের মত ডগা বের হয়ে বংশ বিস্তার করে এবং তাথেকে ফল ধারণ করে। পানি ফল চাষে খুব বেশি প্রশিক্ষনের প্রয়োজন হয় না, সার ও কীটনাশকের পরিমান কম লাগে।
উপজেলার পানি ফল চাষি মোনাজাত সরদার বলেন, গতবছর অল্প চাষ করছিলাম। এবছর ৩ বিঘার বেশি জমিতে পানিফল চাষ করছি। ভালো ফলন হলে আগামিতে তিনি আরো বেশি জমিতে এ চাষ করবো।

এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার চাষিদের সাথে কথা বললে তারা জানান, পানিফল মৌসুমিও অঞ্চল ভিত্তিক হওয়ায় আমরা সঠিক মূল্য ও বাজার তৈরী করতে পারিনি। আমরা মনে করি এটি দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মৌসুমি ফল বানিজ্যিক হিসাবে ব্যাপক চাষের পাশপাশি মার্কেট তৈরী হবে।
কামটা গ্রামের পানি ফল ব্যবসায়ী খোকন বাবু সরদার বলেন, চাষের মৌসুম আসার আগে তিনি অর্ধ শতাধীক চাষীদের মাঝে অর্থ বিনিয়োগ করেন। পরবর্তীতে ফলন আসার পরে বাজার দর অনুযায়ী উৎপাদিত ফসল ক্রয় করেন। এভাবে ৭-৮ বছর তিনি পানি ফল ব্যবসায় নিয়োজিত আছেন। প্রতিদিন তিনি ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, বরগুনা, চিটাগাং, সিলেট, রাজশাহী, বেনাপোল, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ ফল রপ্তানি করেন। বর্তমান জেলার বাইরের বাজারে ৪০০-৬০০ টাকা মোন দরে পাইকারী ভাবে বিক্রি করছেন। তাছাড়া স্থানীয় বাজারে বর্তমানে খুবই কম দরে পানি ফল পাওয়া যাচ্ছে।
এ বিষয়ে দেবহাটা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার শওকত ওসমান জানান, পানিফল চাষ এখনো কৃষির ফসলেরও আওতায় ধরা হয়নি। তবে মৌসুমি ফল হিসাবে গন্য হচ্ছে। আমরা সর্বদা চাষিদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। তাছাড়া একদিকে কম খরচ অন্যদিকে অল্প পরিশ্রমে বেশ লাভবান হওয়ায় চহিদা বেড়েছে পানি ফল চাষিদের।

Read previous post:
​সার্বিক উন্নয়নে দক্ষিন বংশিকুন্ডা ইউনিয়নকে এগিয়ে রাখতে চাই : মো আজিম মাহমুদ

তৃতীয় মাত্রা ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার দক্ষিন বংশিকুন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আজিম মাহমুদের সঙ্গে দৈনিক তৃতীয়...

Close

উপরে