Logo
মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০ | ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

করযোগ্য আয় আছে অথচ কর নেই!

প্রকাশের সময়: ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ - মঙ্গলবার | নভেম্বর ১৭, ২০২০

তৃতীয় মাত্রা

এ বছরের অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরের আয়কর প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে বেশকিছু দিন আগে থেকেই। আগামী ৩০ নভেম্বর আয়কর বিবরণী জমা দেয়ার শেষ তারিখ বলে জানা যায়। কোভিড-১৯-এর কারণে এবারে কর মেলা অনুষ্ঠিত হয়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক আয়োজিত করমেলা, কর আদায়ের জন্য একটি যথাযোগ্য এবং অনুপ্রেরণাকর মেলা ছিল। করমেলায় নির্বিঘ্নে, কোনোরকম ঝামেলা ছাড়াই স্বাচ্ছন্দ্যে করদাতারা তাদের কর বিবরণী জমা দিতে পারতেন। এ ছাড়া নতুন করদাতারা অনুপ্রাণিত হতো কর প্রদান করতে।

যারা সচেতন নাগরিক তারা কর প্রদানের জন্য করমেলাতে ভিড় জমাতেন। দেখা গেছে, অনেকে কর প্রদানে আগ্রহী হলেও কর ভীতির কারণে এড়িয়ে যান। গত বছরের করমেলায় প্রথম তিন দিনে কর আদায় হয়েছিল ১ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। তৃতীয় দিনে দেশব্যাপী আদায় হয়েছে ২৬২ কোটি টাকা। রিটার্ন দাখিল করেছেন ৮৪ হাজার ৫৩৪ জন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা সার্বিক উন্নয়নে প্রয়োজন ভ্যাট ও ট্যাক্স আদায়। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যমতে, গত বছরের হিসাব অনুযায়ী ১৭ কোটি মানুষের এ দেশে আয়কর রিটার্ন জমা দিচ্ছেন মাত্র ১৭ লাখ।

এর মধ্যে কর দিচ্ছেন আরও কম। শতকরা হিসেবে যা ১ শতাংশও নয়। আমাদের মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে এবং বাড়ছে। সরকারিভাবেও এ হিসাব দেখানো হচ্ছে; কিন্তু সে অনুপাতে মানুষ কর দিচ্ছেন না। দেশের জিডিপি অনুপাতে কর আদায় মাত্র ১০ শতাংশ। বিগত ৪ বছরে আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৫৯৩ ডলার। বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু আয় দুই হাজার ডলারের বেশি। করযোগ্য আয়ের আওতায় আসার পরও অনেক মানুষ কর দিচ্ছেন না।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির হিসাবে দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষ করযোগ্য হওয়ার পরও কর দেন না। ৩২ শতাংশ মানুষ নামমাত্র কর দেন। উল্লেখিত ৬৮ শতাংশ মানুষকে করজালের আওতায় আনতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক জরিপে বলা হয়েছে, দেশে করযোগ্য মানুষ রয়েছে ৪ কোটি; কিন্তু কর দিচ্ছেন ১৬ লাখের কিছু বেশি। ৩ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ কর দিতে সক্ষম হলেও তারা কর দিচ্ছেন না।

এ বিরাটসংখ্যক একটা শ্রেণি কর ফাঁকি না দিলে আয়কর আদায়ের পরিমাণ বহুগুণে বৃদ্ধি পেত; যা দ্বারা দেশের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সরকারকে ব্যাংক, বীমা, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো উৎস থেকে ঋণ করতে হতো না। গত বছরের হিসাবসহ আগামী দুই বছরের মধ্যে ১ কোটি মানুষকে করজালের আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। আয়কর বাড়ানোর জন্য জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অফিস স্থাপনের উদ্যোগসহ করমেলার পরিধি বাড়ানো হয়েছে; কিন্তু এ পর্যন্ত এ পরিকল্পনা কতটুক কার্যকর বা ফলপ্রসূ হয়েছে এবারের হিসাবে হয়তো জানা যাবে। তবে খুব বেশি অগ্রগতি আশা করা যায় না, কারণ কোভিড-১৯ জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে।

সামাজিক-অর্থনৈতিক সব দিক থেকে আমরা পিছিয়ে পড়েছি এবং পড়ছি। করোনার তাণ্ডব বিশ্বজুড়ে আগ্রাসী আকার ধারণ করেছে। এর হাত থেকে আমরা কবে নিষ্কৃতি পাব জানি না। আমাদের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রে করোনা মারাত্মকভাবে আঘাত হেনেছে। জাতিসংঘের রেটিং অনুসারে বাংলাদেশ মাত্র কিছুদিন আগে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশ প্রথমবারের মতো ৮.১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

দেশের অর্থনীতি যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল, তাতে আশা করা যাচ্ছিল, আগামী অর্থবছরগুলোতে প্রবৃদ্ধির হার আরও কিছুটা বাড়বে। কিন্তু করোনা সব সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিয়েছে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩ থেকে ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। করোনার সংক্রমণসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে উন্নত বিশ্বসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শ্রমিক ছাঁটাই করছে ব্যাপকভাবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।

পত্রিকান্তরে জানা যায়, সরকারের রাজস্ব আয়ের ৬৪ শতাংশ আসে এনবিআর থেকে। বাকি ৩৬ শতাংশ আসে এনবিআরবহির্ভূত খাত থেকে। এ ছাড়া কর প্রদানের ক্ষেত্রে করদাতারা বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হওয়ায় তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এসব সমস্যার মধ্যে প্রধান হচ্ছে কর কর্মকর্তাদের দ্বারা হয়রানি, উৎকোচ দাবি, করভীতি, জটিল কর পরিশোধ ব্যবস্থা; সর্বোপরি কর আদায় ফরম জটিল হওয়া। স্বয়ংক্রিয় কর প্রদান ব্যবস্থার পাশাপাশি কর কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, উদ্বুদ্ধকরণ ও কর সচেতনতা তৈরি, প্রচার ইত্যাদির পাশাপাশি ভালো কাজের জন্য পুরস্কার ও দায়িত্ব অবহেলার কারণে তিরস্কারের ব্যবস্থা রাখা অবশ্যই প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে করবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। করবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হলে তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষে এককভাবে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ১৭-১৮ কোটি মানুষের দেশে এনবিআরের স্বল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে কর আদায় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সহজ কাজ নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যাতে কর প্রশিক্ষণ, কর সচেতনতা বৃদ্ধি, কর গবেষণা, আধুনিকীকরণ ইত্যাদি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারে, সেজন্য যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কাজ করতে আগ্রহী তাদের সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে এ ব্যাপারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ অর্থ মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসতে হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ অর্থ মন্ত্রণালয়ের বেশকিছু সদস্য অবগত আছেন, দেশে কর সংগ্রহ কার্যক্রম বৃদ্ধির জন্য ফাউন্ডেশন অব চার্টার্ড অ্যান্ড ট্যাক্সেশন অব বাংলাদেশ (এফসিটিবি) নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারের অনুমোদনক্রমে এ বিষয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানটি স্বকর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডার স্ট্যান্ডিং)-এর মাধ্যমে ৬ মাসের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ডিগ্রি প্রদান করছে, যাতে করে তারা ঘরে বসেই অনলাইন কার্যক্রমের মাধ্যমে কর আদায়ে সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করতে পারে এবং নিজেরাও স্বাবলম্বী হতে পারে।

সরকারের সার্বিক সহযোগিতা পেলে এফসিটিবির মাধ্যমে একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে তা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে বলে আশা করি। কাজেই উল্লেখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আয়কর বৃদ্ধি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে সংশ্লিষ্ট সবাই এগিয়ে আসবেন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মনজু আরা বেগম : সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক; নির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ প্রবীণহিতৈষী সংঘ

Read previous post:
উদ্যোক্তা হতে চাইলে ছাত্র থেকে ব্যবসায় নামা উচিৎ!

তৃতীয় মাত্রা আমাদের দেশের কাধে বেকারত্বের হার প্রতি বছরই বাড়ছে। সরকার পারছে না তাদেরকে সুযোগ তৈরী করে দিতে। আর আমাদের...

Close

উপরে