Logo
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২০ | ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

যাত্রাশিল্পে সংকট নিরসনে করণীয়

প্রকাশের সময়: ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ - শনিবার | অক্টোবর ১৭, ২০২০

তৃতীয় মাত্রা

আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমাদের যাত্রা। গুণগত মান সম্পর্কে আলোচনার অবকাশ থাকলেও এর আবেদন এখনও সর্বব্যাপী। ঔপনিবেশিককালে স্বাধীনতা সংগ্রাম, পাকিস্তান আমলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ, বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা, স্বাধীনতার ঘোষণা- এসব কালপঞ্জি গাঁয়ের নিরক্ষর মানুষ সহজে জানতে বা বুঝতে পারে যাত্রাপালার মাধ্যমে।

মনে পড়ে, ১৯৭১ সালে যখন আমাদের যাত্রাসম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাস ‘মাইকেল মধুসূদন’ যাত্রা করে সারা দেশে আলোড়ন তুলেছিলেন, সেই সময় স্কুল-কলেজের কয়েকজন শিক্ষক গ্রিনরুমে এসে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, ‘মাইকেল সম্পর্কে আমরা ছাত্রদের যা বোঝাতে পারিনি, মাত্র দুই ঘণ্টায় অভিনয় করে আপনি তা বোঝাতে পেরেছেন।’ ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ যাত্রাপালায় সাম্য-সম্প্রীতির যে বাণী দেয়া হয়েছে, এমনটি আর কোথাও চোখে পড়ে না- ‘বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়, মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি গুলবাগ এই বাংলা।’

যাত্রাপালার এই চিরায়ত আবেদন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার খুব ভালো ধারণা আছে। ১৯৯৭ সালের ৮ মে গুলিস্তান মহানগর নাট্যমঞ্চ উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, বিদেশি থিয়েটার আসার অনেক আগে থেকে এদেশে যাত্রার জন্ম। যুগ-যুগব্যাপী যাত্রাপালা অন্যায় অসত্য আর ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আঙ্গিকে ও বিন্যাসে আমাদের লোকায়ত জনপদকে আন্দোলিত করে আসছে।

আমরা মনে করেছিলাম তার এ ভাষণের পর যাত্রাশিল্পে একটা গুণগত পরিবর্তন আসবে। কিন্তু কার্যত তেমন কিছু হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আন্দোলিত করেনি। একটার পর একটা সমস্যা যাত্রাকে কুরে কুরে খেয়েছে। যেমন যাত্রানুষ্ঠানের অনুমতি প্রদানে ডিসি, এসপিদের হয়রানিমূলক আচরণ। যাত্রাদল মালিক আবেদনপত্র জমা দেয়ার এক মাস পরও জানতে পারেন না অনুমতি পাবেন কী পাবেন না!

দ্বিতীয়ত, যাত্রাশিল্পীদের নিরাপত্তার অভাব- অভিনয় শুরু হলেই একশ্রেণির স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা অশ্লীল নৃত্যগীত পরিবেশন ও চাঁদা দেয়ার দাবি জানান। তৃতীয়ত, অশ্লীল নৃত্যগীতের যে ব্যাপারটা তাতে আয়োজক কমিটিও যুক্ত থাকে। তেমনি একশ্রেণির অসৎ যাত্রাদল মালিকও এসব অপকর্মে জড়িত হয়ে পড়েন। চতুর্থত, অনেক সময় থানা-পুলিশও উৎকোচের মাধ্যমে এসব অপসংস্কৃতিকে প্রশয় দিয়ে থাকে।

বর্তমান সরকারের আমলে আমরা একটি যাত্রা নীতিমালা পেয়েছি, যা গেজেটভুক্ত হয়েছে ২০১২ সালের ৩০ আগস্ট। দুঃখের বিষয়, যে উদ্দেশ্যে আমরা একটি নীতিমালা প্রণয়ের দাবি তুলেছিলাম, বাস্তবে তা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। নীতিমালায় বলা হয়েছে (ধারা-৮) ‘যে কোনো স্থানে যাত্রা প্রদর্শনী করিতে হইলে পূর্বেই স্থানীয় জেলা প্রশাসনের অনুমতি লইতে হইবে। অনুমতির জন্য আবেদন পাওয়ার সাত কর্মদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসনকে অনুমতির বিষয়টি নিষ্পত্তি করিতে হইবে। মৌসুমে অনুমতিজনিত প্রশাসনিক জটিলতায় যাত্রা পরিক্রমা যাহাতে ব্যাহত না হয় সেই বিষয়ে জেলা প্রশাসক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ বাস্তবতার সঙ্গে এসব কথার কোনো মিল নেই।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী শারদীয় দুর্গোৎসব থেকে শুরু হয় যাত্রাশিল্পের নতুন মৌসুম। সাম্প্রতিক কয়েক বছর ধরে দুর্গাপূজায় যাত্রা বন্ধ। এ বাস্তবতায় বর্তমান করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং যাত্রার সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কতিপয় প্রস্তাবনা তুলে ধরছি- ১. সরকারের স্বাস্থ্যবিধি ও নীতি-নিয়ম অনুসারে যাত্রাপালা প্রদর্শনীর অনুমতি দেয়ার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যেক জেলা প্রশাসনে প্রজ্ঞাপন জারি; ২. বিশেষ ব্যবস্থায় অন্তত দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাত ১১টা পর্যন্ত যাত্রানুষ্ঠানের অনুমতি দেয়া, ৩. যাত্রার নামে অপসংস্কৃতি নিরসনে পুলিশ প্রশাসনকে চিঠি প্রেরণ; ৪. যাত্রাপালা অনুষ্ঠান তদারকির জন্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে প্রত্যেক জেলা শিল্পকলাকে বিশেষ নির্দেশ জারি; ৫. বিশেষ কোটায় যাত্রাদলে অনুদান প্রথা চালু করা এবং এক্ষেত্রে দলপ্রতি অন্তত ১০ লাখ টাকা করে দেয়া।

সবশেষে সরকারি কর্মকর্তা ও নীতি-নির্ধারকদের একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে একদিনের জন্যও যাত্রা বন্ধ ছিল না। সেই সময় সারা দেশে যাত্রা-গানের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। সেই গৌরবময় ঐতিহ্যকে স্মরণ করে আমরা কি দেশের যাত্রাকে আবার সচল করে তুলতে পারি না?

Read previous post:
কবরস্থানে নেওয়ার পর হঠাৎ নড়াচড়ে কেঁদে উঠলো শিশুটি

তৃতীয় মাত্রা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর ‘মৃত’ ঘোষণা করা নবজাতক হঠাৎ নড়াচড়া করে কেঁদে ওঠায় বিস্ময়ের সৃষ্টি...

Close

উপরে