Logo
বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০২০ | ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের পটভূমি ও বিস্তারিত বর্ণনা-(১)

প্রকাশের সময়: ৯:৪১ অপরাহ্ণ - রবিবার | অক্টোবর ৪, ২০২০

তৃতীয় মাত্রা

তৃতীয় মাত্রা ধর্ম ডেস্ক : ইসলামের স্মরণীয় যুদ্ধগুলোর মধ্যে বদর অন্যতম। এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবিরা মুসলমানদের কাছে পরবর্তীকালে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিলেন। এ কারণেই যে কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় সাক্ষী উপস্থাপনের ক্ষেত্রে পক্ষগুলো নিজ নিজ দাবির যথার্থতা বুঝাতে কতজন বদরী সাহাবী তাদের সঙ্গে রয়েছেন তার উল্লেখ করত। রাসূল (সা.)-এর জীবনীতে বদরে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের ‘বদরী’ বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। পটভূমি: দ্বিতীয় হিজরীর জমাদিউল আউয়াল মাসের মাঝামাঝি মদীনায় খবর পৌঁছায় আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মক্কা থেকে সিরিয়ায় বাণিজ্য কাফেলা যাত্রা করেছে। মহানবী (সা.) এ কাফেলাকে ধরার জন্য জাতুল উশাইরা পর্যন্ত গমন করেন ও পরবর্তী মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষা করেন। কিন্তু ঐ কাফেলার সন্ধান পান নি। কাফেলাটি প্রত্যাবর্তনের সময় শরতের প্রথম দিক নির্দিষ্ট ছিল। কারণ সাধারণত এ সময়েই সিরিয়া থেকে মক্কায় কাফেলাসমূহ ফিরে আসে। যে কোন যুদ্ধে তথ্য হলো জয়ের প্রথম পদক্ষেপ। যদি যুদ্ধের সেনাপতি শত্রুর ক্ষমতা,অবস্থান ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে সঠিকভাবে না জানে তবে যুদ্ধের প্রথমেই পরাস্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। ইসলামের নবীর যুদ্ধকৌশলের প্রশংসিত ও লক্ষণীয় একটি দিক হলো- যার প্রমাণ প্রতিটি যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ থেকে আমরা পাই- শত্রুর অবস্থান ও প্রস্তুতি সম্পর্কে অগ্রিম তথ্য সংগ্রহ। তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি বৃহৎ ও ক্ষুদ্র সকল যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ। আল্লামা মাজলিসীর৪৫১ বর্ণনা মতে রাসূল (সা.) আদী নামের এক সাহাবীকে তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করেন।‘হায়াতে মুহাম্মদ’ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক গ্রন্থ অনুযায়ী মহানবী কুরাইশ কাফেলার যাত্রাপথ, প্রহরীর সংখ্যা ও আনীত পণ্যের ধরন সম্পর্কে জানার জন্য তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ্ ও সাঈদ ইবনে যাইদকে প্রেরণ করেছিলেন। তাঁদের আনীত তথ্য নিম্নরূপ ছিল : ১. কাফেলাটি বেশ বড় এবং মক্কার সব গোত্রের লোকই তাতে রয়েছে। ২. কাফেলার নেতৃত্বে রয়েছে আবু সুফিয়ান এবং ৪০ জন প্রহরী ও রক্ষী তাদের সঙ্গে রয়েছে। ৩. এক হাজার উট মাল বহন করে নিয়ে আসছে যার মূল্য পঞ্চাশ হাজার দিনারের সমপরিমাণ। যেহেতু মদীনার মুহাজির মুসলমানদের বিপুল সম্পদ মক্কার কুরাইশদের হাতে অবরুদ্ধ (ক্রোক) হয়েছিল সেহেতু মুসলমানদের জন্য কুরাইশদের বাণিজ্য পণ্য অবরোধের প্রয়োজন ছিল। যদি কুরাইশরা মুসলমানদের সম্পদ অবরোধ অব্যাহত রাখে তবে মুসলমানরাও স্বাভাবিকভাবে কুরাইশদের বাণিজ্য পণ্য অবরোধ করে গনীমত হিসাবে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেবে। এ লক্ষ্য নিয়েই রাসূল (সা.) সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “ হে লোকসকল! কুরাইশ কাফেলা নিকটেই। তাদের সম্পদ হাতে পেতে মদীনা থেকে বেরিয়ে যাও। এতে তোমাদের অর্থনৈতিক অসুবিধা দূর হবে।” মহানবী (সা.) আবদুল্লাহ্ ইবনে উম্মে মাকতুমকে মদীনার মসজিদে ইমামতির এবং আবু লাবাবাকে মদীনার সার্বিক দায়িত্ব দান করে দ্বিতীয় হিজরীর রমজান মাসের ৮ তারিখে তিনশ’ তের জন সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে কুরাইশদের সম্পদ আটক করার উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে বের হলেন। যাফরান নামক স্থানের দিকে মহানবীর যাত্রা সংবাদদাতাদের প্রেরিত বার্তা পেয়ে মহানবী (সা.) হিজরী বর্ষের দ্বিতীয় সালের রমজান মাসের আট তারিখ সোমবার কুরাইশ কাফেলার উদ্দেশ্যে যাফরানের দিকে যাত্রা করেন। তিনি আলী ইবনে আবি তালিব ও মুসআবের হাতে পৃথক দু’ টি পতাকা প্রদান করেন। প্রেরিত সেনাদলে বিরাশি জন মুহাজির, খাজরাজ গোত্রের একশ’ সতের জন এবং একষট্টি জন আওস গোত্রের লোক ছিলেন। সেনাদলে মাত্র তিনটি ঘোড়া ও সত্তরটি উট ছিল। ইসলামের সে যুগে মুসলিম সমাজে আত্মত্যাগ ও শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা এতটা তীব্র ছিল যে, অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক বালকও সে যুদ্ধে অংশগ্রহণের আগ্রহ ব্যক্ত করেছিল; কিন্তু রাসূল (সা.) তাদেরকে মদীনায় ফিরিয়ে দেন। মহানবী (সা.)-এর কথা হতে আগেই বোঝা গিয়েছিল, এ অভিযান মুসলমানদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি ও অর্থনৈতিক মুক্তির সুযোগ এনে দেবে। কুরাইশরা যেসব সম্পদ মক্কায় বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল তা-ই মুসলমানদের আশার উপকরণ ছিল। মুসলমানরা তা কব্জা করার উদ্দেশ্যেই মদীনা থেকে বের হয়েছিল। এ কাজের বৈধতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, কুরাইশরা মক্কায় মুসলমানদের সমগ্র সম্পদ ক্রোক করেছিল এবং তাদের মক্কায় যাতায়াতের পথরোধ করেছিল। ফলে তারা তাদের জীবন নির্বাহের উপকরণ হতে বঞ্চিত ছিল। স্পষ্ট যে, যে কোন জ্ঞানসম্পন্ন মানুষই বলবেন শত্রুর সঙ্গে সেরূপ আচরণই করা উচিত যেরূপ আচরণ সে তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে করেছে। প্রকৃতপক্ষে কুরাইশদের কাফেলাগুলোর ওপর মুসলমানদের আক্রমণের কারণ মুসলমানদের প্রতি তাদের নির্যাতনমূলক আচরণ যা কোরআনও উল্লেখ করেছে এবং মুসলমানদের এ আক্রমণের অনুমতি দিয়ে বলেছে : “ যাদের প্রতি আক্রমণ করা হয়েছে তাদের প্রতিরোধের অনুমতি দেয়া হলো। কারণ তারা নির্যাতিত হয়েছে এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাদের সাহায্য করতে পূর্ণ ক্ষমতাবান।” আবু সুফিয়ান সিরিয়ার দিকে যাত্রার পূর্বেই জেনেছিল যে,মহানবী (সা.) তাদের কাফেলাকে পশ্চাদ্ধাবন করতে পারেন। এ কারণেই সে প্রত্যাবর্তনের পথে সতর্কতা অবলম্বনের লক্ষ্যে যে কাফেলারই মুখোমুখি হতো প্রশ্ন করত মুহাম্মদ (সা.) কাফেলার পথ রুদ্ধ করে রেখেছেন কি না? যখন তার কাছে বার্তা পৌঁছল মহানবী (সা.) সঙ্গীদের সঙ্গে নিয়ে মদীনা হতে বেরিয়ে এসেছেন ও কুরাইশ কাফেলার পশ্চাদ্ধাবনের মনোবৃত্তিতে বদর প্রান্তরের নিকটবর্তী যাফরানে ছাউনী ফেলেছেন তখন সে কাফেলা নিয়ে অগ্রসর হতে নিবৃত্ত হয়ে কুরাইশদের এ বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করাকে অধিকতর যুক্তিযুক্ত মনে করল। সে দামদাম (জামজাম) ইবনে আমর গিফারী নামক এক দ্রুতগামী উটচালককে ভাড়া করে নির্দেশ দিল মক্কায় পৌঁছে মক্কার সাহসী কুরাইশ বীরদের ও কাফেলার সঙ্গে যাদের সম্পর্ক রয়েছে তাদের জানাও তারা যেন মুসলমানদের হাত থেকে কুরাইশ কাফেলাকে বাঁচাতে মক্কা থেকে এখানে এসে পৌঁছায়। দামদাম দ্রুত মক্কায় পৌঁছে আবু সুফিয়ানের নির্দেশ অনুযায়ী নিজ উষ্ট্রের কান কেটে ও নাক ছিদ্র করে, তার পিঠে বসবার স্থানটি বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে অগ্র ও পশ্চাৎ ছিন্ন করে বলল,“ হে মক্কার অধিবাসিগণ! তোমাদের বাণিজ্য পণ্য বহনকারী উটগুলো আক্রান্ত হয়েছে। মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীরা তোমাদের পণ্য লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছে। তোমাদের পণ্য তোমাদের হাতে পৌঁছবে বলে মনে হয় না, দ্রুত কুরাইশ কাফেলার সাহায্যে এগিয়ে এস।” উষ্ট্রের কান ও নাক হতে অঝোরে রক্ত ঝরছিল। উটের এ করুণ অবস্থাদৃষ্টে এবং দামদামের মর্মস্পর্শী বক্তব্য ও সাহায্যের আহ্বানে মক্কার অধিবাসীদের রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠল। সকল যোদ্ধা ও সাহসী পুরুষ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে মক্কা থেকে বের হলো। মক্কার প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে শুধু আবু লাহাব এ দলটির সঙ্গে আসেনি, তবে সে আস ইবনে হিশাম নামে এক ব্যক্তিকে তার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য চার হাজার দিরহাম দিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য রাজী করায়। কুরাইশ গোত্রপতিদের মধ্যে উমাইয়্যা ইবনে খালাফ বিশেষ কারণে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চাচ্ছিল না। কারণ সে শুনেছিল মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, সে মুসলমানদের হাতে নিহত হবে। কুরাইশ গোত্রপ্রধানরা দেখল এরূপ ব্যক্তিত্ব যদি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে তবে নিশ্চিতভাবে তাতে কুরাইশদের ক্ষতি ও মর্যাদাহানি হবে। উমাইয়্যা ইবনে খালাফকে যুদ্ধে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে কুরাইশরা দু’ ব্যক্তিকে (যারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বের হচ্ছিল) উমাইয়্যার কাছে পাঠায়। সে যখন কুরাইশদের কাছে বসেছিল তখন এ দু’ ব্যক্তি একটি ট্রেতে সুরমাদানি নিয়ে তার কাছে উপস্থিত হয়ে বলে,“ হে উমাইয়্যা! যখন তুমি নিজ গোত্র ও ভূমির সম্ভ্রম রক্ষা ও বাণিজ্য পণ্য উদ্ধারের কাজ হতে বিরত থেকে নারীদের মত ঘরের কোণে বসে যুদ্ধ এড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করেছ তখন নারীদের মত এ সুরমা চোখে দিয়ে তাদের সঙ্গেই বসে থাক, কুরাইশ বীর যোদ্ধাদের তালিকা হতে নিজের নাম উঠিয়ে নাও।”এরূপ আক্রমণাত্মক কথা উমাইয়্যাকে এতটা উত্তেজিত করল যে, সে অবচেতনভাবেই যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে কুরাইশ কাফেলার সঙ্গে বাণিজ্য পণ্য উদ্ধারের লক্ষ্যে রওয়ানা হলো। কুরাইশ যে সমস্যার মুখোমুখি হলো যাত্রার সময় নির্ধারিত হলো। কুরাইশ গোত্রপ্রধানরা বুঝতে পারল মুসলমানদের পূর্বেই বনি বকর গোত্রের মতো কঠিন শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং পশ্চাৎ দিক থেকে তাদের আক্রমণের শিকার হতে পারে। কারণ বনি বকরের সঙ্গে কুরাইশদের রক্তের শত্রুতা ছিল। এ ঘটনাটি ইবনে হিশাম তাঁর সিরাত গ্রন্থে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। বনি বকর গোত্রের প্রসিদ্ধ ব্যক্তি সুরাকা ইবনে মালিক এ সময় তাদের কাছে এসে নিশ্চয়তা দান করল যে, এমন কিছু ঘটার কোন সম্ভাবনা নেই এবং কুরাইশরা নিশ্চিত মনে মক্কা হতে বেরিয়ে যেতে পারবে। মহানবী (সা.) কুরাইশ বাণিজ্য কাফেলাকে অবরোধ করার লক্ষ্যে মদীনা থেকে বের হয়েছিলেন এবং যাফরান নামক স্থানে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বাণিজ্য কাফেলার আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন। এ সময় হঠাৎ করে নতুন খবর এসে পৌঁছাল যা ইসলামের সৈনিকদের চিন্তা-চেতনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাল এবং তাদের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। মহানবীর কাছে সংবাদ পৌঁছেছিল যে, মক্কাবাসীরা তাদের বাণিজ্য কাফেলাকে রক্ষার উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে বের হয়েছে এবং আশেপাশেই অবস্থান গ্রহণ করেছে। মক্কার সব গোত্রই এ সৈন্যদলে অংশগ্রহণ করেছে। মুসলমানদের মহান নেতা দু’ পথের মাঝে নিজেকে লক্ষ্য করলেন। একদিকে তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা বাণিজ্যপণ্য অবরোধের উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে বের হয়েছিলেন এবং এ কারণে মক্কা থেকে আগত বড় একটি সেনাদলের মুখোমুখি হওয়ার উপযুক্ত প্রস্তুতি তাঁদের ছিল না; লোকবল এবং যুদ্ধাস্ত্র উভয় ক্ষেত্রেই তাঁদের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। অন্যদিকে যে পথে তাঁরা মদীনা থেকে বের হয়েছিলেন সে পথেই যদি পুনরায় মদীনায় ফিরে যেতেন তবে এতদিন পরিচালিত বিভিন্ন সামরিক মহড়াগুলোর ফলে অর্জিত মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হতো। হয়তো এর ফলে শত্রুরা দুঃসাহস দেখিয়ে আরো অগ্রসর হয়ে ইসলামের কেন্দ্র মদীনাতেও আক্রমণ করে বসত। তাই মহানবী (সা.) পশ্চাদপসরণকে উপযুক্ত মনে করলেন না, বরং যেটুকু শক্তি রয়েছে তা নিয়েই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিরোধ করাই সমীচীন মনে করলেন। অন্য যে বিষয়টি এখানে লক্ষণীয় ছিল তা হলো মদীনা থেকে আগত সেনাদলের অধিকাংশই ছিলেন আনসার যুবক। তাঁদের মধ্যে শুধু ৭৪ জন মুহাজির ছিলেন। তদুপরি মহানবী (সা.) আকাবায় আনসারদের সঙ্গে যে চুক্তি করেছিলেন তা ছিল প্রতিরক্ষামূলক- আক্রমণাত্মক নয়। তাই তাঁরা মদীনার বাইরে তাঁর শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন এমন কোন প্রতিশ্রুতি সেখানে ছিল না। এমন মুহূর্তে মুসলিম সেনাদলের সর্বাধিনায়ক কি করলেন? তিনি সামরিক পরামর্শ সভার আহবান ছাড়া আর কোন পথ খুঁজে পেলেন না। এভাবে তিনি মতামত জানার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চিন্তা করলেন। সামরিক পরামর্শ সভা তিনি দাঁড়িয়ে সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন, “এ বিষয়ে তোমাদের মত কি?” সর্বপ্রথম (প্রথম খলিফা) আবু বকর দাঁড়িয়ে বললেন,“কুরাইশদের সম্ভ্রান্ত সাহসী ব্যক্তিরা মক্কা থেকে আগত সেনাদলে অংশগ্রহণ করছে। কুরাইশ কখনই অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করেনি এবং তাদের সম্মানিত স্থান থেকে নিচে নেমে অপমানকে গ্রহণ করেনি। অন্যদিকে আমরা মদীনা থেকে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে আসি নি।” –(অর্থাৎ যুদ্ধ না করার মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে এবং মদীনায় ফিরে যাওয়াই উত্তম।) রাসূল (সা.) তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন,“ বসুন।” এরপর (দ্বিতীয় খলিফা) হযরত উমর দাঁড়িয়ে হযরত আবু বকরের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। রাসূল তাঁকেও বসার নির্দেশ দিলেন। তখন হযরত মিকদাদ (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন,“ হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের অন্তর আপনার সঙ্গে। আল্লাহ্ আপনাকে যা নির্দেশ দিয়েছেন আপনি তারই অনুসরণ করুন। মহান আল্লাহর শপথ,কখনই আমরা আপনাকে সেরূপ কথা বলব না যেরূপ কথা বনি ইসরাইল হযরত মূসাকে বলেছিলেন। যখন হযরত মূসা (আ.) বনি ইসরাইলকে জিহাদের আহবান জানিয়েছিলেন তখন তারা হযরত মূসাকে বলেছিল : হে মূসা! তুমি ও তোমার প্রভু তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর এবং আমরা এখানেই বসে থাকব। কিন্তু আমরা এর বিপরীতে আপনাকে বলব : আপনি আপনার প্রতিপালকের অনুগ্রহের ছায়ায় জিহাদ করুন এবং আমরাও আপনার অনুগত হয়ে আপনার অধীনে যুদ্ধ করব।” মহানবী (সা.) মিকদাদের এ কথায় অত্যন্ত খুশী হলেন এবং তাঁর জন্য মহান আল্লাহর নিকট বিশেষভাবে দোয়া করলেন। ইবনে হিশাম, মাকরিযী এবং তাবারী তাঁদের ইতিহাস গ্রন্থসমূহে মহানবীর সামরিক পরামর্শ সভার ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। তাবারী হযরত আবদুল্লহ্ ইবনে মাসউদের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন,“ বদরের দিন আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল মিকদাদের অবস্থানে যদি আমি অবস্থান নিতে পারতাম। কারণ তিনি বিরূপ এক পরিবেশে বলেছিলেন : আমরা কখনই বনি ইসরাইল জাতির মতো আপনাকে (মহানবীকে) বলব না যে,আপনি ও আপনার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ করুন এবং আমরা এখানে বসে রইলাম। যখন মহানবীর চেহারা ক্রোধে রক্তিম হয়ে গিয়েছিল তখন হযরত মিকদাদ এমন কথা বলেছিলেন যাতে মহানবীর চেহারা আনন্দে উদ্ভাসিত হয়েছিল। তাই আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল ঐ ইপ্সিত অবস্থানটি যদি আমি অর্জন করতে পারতাম!” তাই বোঝা যায়, মিকদাদের পূর্বে শায়খাইন আতঙ্ক ও হতাশার বাণী শুনিয়েছিলেন ও মদীনায় ফিরে যাওয়ার জন্য তাগিদ দিয়েছিলেন। এটি ছিল একটি পরামর্শ সভা। তাই সভায় উপস্থিত প্রত্যেকেরই নিজস্ব মত প্রকাশের অধিকার ছিল। পরামর্শ সভার সিদ্ধান্ত ও আনসার দলপতির মত যে মতগুলো এতক্ষণ উপস্থাপিত হয়েছে তা ব্যক্তিগত মত হিসাবেই প্রণিধানযোগ্য। মূলত পরামর্শ সভার লক্ষ্য ছিল আনসারদের মত জানা। যতক্ষণ আনসাররা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিবে ততক্ষণ ছোট কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণও সম্ভব ছিল না। এতক্ষণ মতামত দানকারী ব্যক্তিবর্গের সকলেই ছিলেন মুহাজির। এ কারণেই মহানবী (সা.) আনসারদের মত নেয়ার জন্য তাঁর কথার পুনরাবৃত্তি করে বললেন,“ তোমরা তোমাদের মত প্রদান কর।” সা’ দ ইবনে মায়ায আনসারী দাঁড়িয়ে বললেন,“ আপনি কি আমাদের মত চাচ্ছেন?” রাসূল বললেন,“ হ্যাঁ।” মায়ায বললেন,“ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি। আমরা সাক্ষ্য দিয়েছি আপনার আনীত ধর্ম সত্য। এ বিষয়ে আমরা আপনার সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধও হয়েছি। তাই আপনি যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, আমরা তারই অনুসরণ করব। সেই আল্লাহর শপথ ,যিনি আপনাকে নবী হিসাবে প্রেরণ করেছেন। যদি আপনি সমুদ্রেও প্রবেশ করেন (লোহিত সাগরের দিকে ইশারা করে) তবে আমরাও আপনার পশ্চাতে তাতে প্রবেশ করব। আমাদের এক ব্যক্তিও আপনার অবাধ্য হবে না। আমরা শত্রুর মুখোমুখি হতে কুণ্ঠিত নই। আত্মত্যাগের ক্ষেত্রে আমরা এতটা প্রমাণ করব যে, এতে আপনার চক্ষু উজ্জ্বল হবে। আপনি আল্লাহর নির্দেশে আমাদের যেখানেই যেতে বলবেন, আমরা যেতে প্রস্তুত।” সা’ দের এ বক্তব্য মহানবীর অন্তরে প্রফুল্লতা বয়ে আনল এবং তাঁর সত্য ও লক্ষ্যের পথে দৃঢ়তা এবং জীবনসঞ্চারক আশার বাণী হতাশা ও শঙ্কার কালো ছায়াকে দূরীভূত করল। সত্যের এ সাহসী সৈনিকের বক্তব্য এতটা উদ্দীপক ছিল যে, মহানবী (সা.) সাথে সাথে যাত্রার নির্দেশ দিয়ে বললেন, “ যাত্রা শুরু কর। তোমাদের জন্য সুসংবাদ, হয় তোমরা কাফেলার মুখোমুখি হবে ও তাদের সম্পদ ক্রোক করবে, নতুবা কাফেলার সাহায্যে এগিয়ে আসা দলের মুখোমুখি হয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। আমি কুরাইশদের নিহত হওয়ার স্থানটি দেখতে পাচ্ছি,তাদের ভয়ঙ্কর ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।” মুসলিম সেনাদল নবীর পশ্চাতে যাত্রা শুরু করল এবং বদরের প্রান্তরে পানির আধারের কাছে ছাউনী ফেলল।

Read previous post:
মিন্নির ফাঁসির রায় যেসব কারণে

তৃতীয় মাত্রা আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির কারণে হতভাগা রিফাত শরীফ নির্মমভাবে খুন হয়েছেন এবং তার বাবা-মা পুত্রহারা হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন...

Close

উপরে