Logo
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ | ৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বৈরুতে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কুশীলবদের পাঁয়তারা

প্রকাশের সময়: ২:২৮ অপরাহ্ণ - বুধবার | আগস্ট ১৯, ২০২০

তৃতীয় মাত্রা

গত ৪ আগস্ট লেবাননের রাজধানী ও বন্দর নগরী বৈরুত শহর প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে। বাড়িঘর ভেঙে পড়ে। বহুতল ভবনের ব্যালকনি ছিটকে পড়ে, জানালার কাচ চুরচুর হয়ে পড়ে রাস্তায়। সঙ্গে ভূ-কম্পন যা ৩.৫ মাত্রা রেকর্ড হয়। ভূ-মধ্য সাগরের অপর পারে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে গ্রিসে কম্পন অনুভূত হয়। কয়েক দশক ধরে লেবাননের মানুষ অনেক বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে, প্রত্যক্ষ করেছে ইসরাইলের আগ্রাসন, সিরিয়ার ট্যাংকের আওয়াজ। কিন্তু এবারের বিস্ফোরণ অনেকটাই অচেনা।

পরে প্রকাশ পেল বন্দরে অবস্থিত গুদামে বিস্ফোরণ ঘটেছে। কী ছিল সেখানে? প্রায় সাত বছর ধরে ভয়ানক শক্তিশালী উচ্চ বিস্ফোরকের উপাদান অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বন্দরের একটি গুদামে রক্ষিত আছে। যার পরিমাণ ছিল ২৭৫০ টন। বিশ্বে পারমাণবিক শক্তি মাপা হয় বহুল প্রচলিত বিস্ফোরক টিএনটি বিস্ফোরক ক্ষমতাকে একক ধরে। সাধারণত পারমাণবিক বোমার তুলনা করা হয় কিলোটন টিএনটি দিয়ে। সেই আদলে ২৭৫০ টন আমোনিয়াম নাইট্রেট ২.৭ কিলোটন টিএনটির অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বোমার মতো ধ্বংস ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে কিন্তু পারমাণবিক বোমার ক্ষতিকর বিকিরণ ছাড়া; যা হিরোশিমার অন্তত তিন ভাগের এক ভাগ ধ্বংসকারী ছিল। প্রায় ২২০ জন মৃত্যু বরণ করেছেন, ৬ হাজার মানুষ আহত হয়েছে এবং ৩ লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। বন্দরে বিশাল কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম ধ্বংস হয়েছে। ফলে খাদ্যসংকট থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় বৈদেশিক সাহায্য। এ ছাড়া দেশের নাজুক অর্থনীতি ও অপ্রতুল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে না। কোনো রকম নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। কেনই বা সেখানে পড়ে থাকল এত দিন ধরে? প্রশাসন কী করেছে? মানুষের অসংখ্য প্রশ্ন আর স্বজন ও সহায়-সম্বল হারানো মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে এবং সরকারের মন্ত্রীরা একে একে পদত্যাগ করতে থাকলে সরকারের পতন ঘটে। রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে বিভাজিত দেশটির ক্ষমতার ভাগাভাগির এক অনন্য নজির নিয়ে দেশের সংবিধান। প্রায় সব রাজনৈতিক দল ধর্মীয় বিভাজনকে প্রতিনিধিত্ব করে। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য বিদেশি মদদ পুষ্ট। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বলি হওয়া রাষ্ট্রের একটি অনন্য উদাহরণ। দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে থাকা জনগণের অনুপাত প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। কর্মহীনতা প্রায় ৩০ শতাংশ। সেই ফ্রান্স চলে যাওয়ার পর থেকে গৃহযুদ্ধের কারণে দেশটি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বরং ক্ষমতা দখলের দলাদলিতে ক্রমেই বিভাজিত হয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। সৃষ্টি হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। দোদুল্যমান সরকার, প্রশাসনে বিভক্তি, দুর্নীতি ও অদক্ষতা দেশটির উন্নয়নে বিরাট বাধা। রাজনীতি সব সময় সশস্ত্র মিলিশিয়ার হাতে চলে গিয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে গণবিস্ফোরণের মুখে পতন ঘটে একটি সরকারের। আর এই বিস্ফোরণের পর বর্তমান সরকার ক্ষমতা ছাড়ল। পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী বললেন, এ দেশের দুর্নীতি বন্ধ করা খুব কঠিন কাজ। তিনি মন্তব্য করেছেন একমাত্র ঈশ্বর পারেন এ দেশকে বাঁচাতে।

কীভাবে এই অতি বিস্ফোরক কেমিক্যাল বৈরুতে আসল তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেক অজানা তথ্য বের হয়ে আসছে; যা থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেক শিক্ষা নেওয়ার আছে। উন্নত আধিপত্যবাদী দেশগুলোর উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই, সেটা পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশ হোক আর আগের সমাজবাদী দেশ হোক। উন্নয়নশীল দেশগুলো উপনিবেশ প্রভূ থেকে মুক্ত হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সীমাবদ্ধতাকে পুঁজি করে তাদের সম্পদ লুটে নেওয়ার অমানবিক ও বিবেকহীন কৌশল উন্নয়নশীল জগতের মানুষকে নিঃসন্দেহে চমকে দেয়। লেবাননের মতো দেশকে সক্ষম ও সামর্থ্যবান রাষ্ট্রে পরিণত করার চেয়ে তাদের অস্থিতিশীল রেখে ভূ-রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে দেখা যায়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টে লেবাননবাসীকে সহানুভূতি জানাতে এসে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে।

বিস্ফোরকের গমনাগমনের আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য বিশ্ব মিডিয়াতে উঠে এসেছে। মূলত অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট যেমন উচ্চ বিস্ফোরক তৈরির উপাদান তেমনি সার উত্পাদনের উপাদানও বটে। তথ্যে জানা যায় যে, আফ্রিকার মোজাম্বিকের একটি কোম্পানি জর্জিয়ার কোম্পানিকে ২৭৫০ টন আমোনিয়াম নাইট্রেটের জন্য ক্রয়াদেশ দেয়। এই উপাদান গিয়ে সেখানকার পশ্চিমা মালিকানাধীন একটি কোম্পানি পাশের দেশ জাম্বিয়া ও জিম্বুয়ে কার্যত অবৈধ খনি কার্যক্রমের জন্য উচ্চ বিস্ফোরক উত্পাদনকারী। এই অবৈধ খনি কার্যক্রমের কোম্পানিগুলো বেশির ভাগ চীনা মালিকানাধীন। আফ্রিকা থেকে চীনের মোট আমদানির ৪৯ শতাংশ এই সব খনিজদ্রব্য বলে খবরে প্রকাশ। শ্রমিক নিরাপত্তার ন্যূনতম সুব্যবস্থা না থাকায় অনেক মানবাধিকার সংগঠন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। অবৈধ খনি কার্যক্রমের জন্য মানুষঘাতী বিস্ফোরকের উপাদান আহরণ, চলাচল, গুদামজাতকরণ, বৈধ ব্যবহার নিরাপত্তার শর্তগুলো নিশ্চিত না করে সমগ্র মানব জাতিকে অনিরাপদ করে তোলার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগগুলোকে নিরুত্সাহিত করার জন্য বিপজ্জনক বস্তুর পরিবহন ও সংরক্ষণ যাতে করে নিরীহ মানুষের জীবন ও সম্পদ বিনাশের কারণ না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক নজরদারিতা সৃষ্টি করা জরুরি। জর্জিয়া থেকে ১৯১৩ সালে রাশিয়ার জাহাজে করে এই বিস্ফোরক দ্রব্য ভূমধ্য সাগর দিয়ে মোজাম্বিকের বন্দরে যাবার সময় পথিমধ্যে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে ভূমধ্য সাগরের সবচেয়ে কর্মচঞ্চল বন্দর বৈরুতে নোঙর করলেই বিপত্তি সৃষ্টি হয় এবং বৈরুত বন্দরের কাস্টম জাহাজটি আটক করলে বিষয়টি বিচারাধীন মামলার কারণে স্থিতাবস্থা তৈরি হয়। জাহাজের মালিকপক্ষ জাহাজটি বোমায় রূপ নেয়। পরবর্তী সময় বিস্ফোরক দ্রব্য খালাস করে বন্দরের গুদামে নেওয়া হয়। কাস্টম ও বন্দর ব্যবস্থাপকদের মধ্যে শুরু হয় বিতণ্ডা। লেবাননের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় খ্রিষ্টান প্রেসিডেন্ট ও সুন্নি প্রধানমন্ত্রীর মধ্যের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এখানেও চরমভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, ফলে মাশুল গুনতে হয়েছে সাধারণ জনগণকে। কাস্টম বিভাগ প্রেসিডেন্টের অনুসারী এবং পোর্ট ব্যবস্থাপনা প্রধানমন্ত্রীর অনুসারী। দুই বিভাগের মধ্যে বিদ্যমান অসংগতি, দুর্নীতি থেকে প্রশাসনের অদক্ষতা থেকে মাশুল গুনতে হলো লেবাননবাসীকে, সঙ্গে প্রশ্ন উঠল ধর্মভিত্তিক ক্ষমতা বণ্টনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা জাতিগত বিভেদকে উসকে দিয়ে জাতীয় সংহতি তৈরি ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়নি।

লেবানন একটি ছোট দেশ হলেও তেল সম্পদের আধিক্য না থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বলির পাঁঠা হয়ে ধুকধুক করে টিকে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব থেকে ইসরাইলের আধিপত্য নিশ্চিত ও পশ্চিমা বিশ্বের সুয়েজ খাল নিয়ন্ত্রণের ভূ-রাজনীতি এবং তত্কালীন স্নায়ুযুদ্ধ দেশটিকে রাজনৈতিকভাবে ছিন্ন ভিন্ন করে রেখেছে। সবাই দেশটির ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীকে হাতিয়ার বানিয়েছে। দেশটির ২৭ শতাংশ জনগণ শিয়া মুসলিম এবং ২৭ শতাংশ সুন্নি মুসলিম এবং ৩১ শতাংশ ম্যারোনাইট খ্রিষ্টান এবং বাকিরা ছোট ছোট হওয়ায় তেমন ভূমিকা রাখতে পারে না। ধর্মীয় গোষ্ঠীর আনুপাতিক হারে ক্ষমতার বণ্টন ছিল লেবাননের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার একটি নতুন দিক। দেশের প্রেসিডেন্ট হবেন সবসময় ম্যারোনাইট খ্রিষ্টান ধর্ম থেকে। সুন্নি সম্প্রদায় থেকে হবে দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং শিয়া সম্প্রদায় থেকে হবে পার্লামেন্টের স্পিকার। বাহ্যিকভাবে খুব নির্মোহ ও নির্ভেজাল মনে হলেও কার্যত জাতিগত বিভেদ নিরসনে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। রাজনৈতিক দলগুলো তৈরি হয়েছে ধর্মীয় গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে এবং এদের সহায়তা করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে থাকা দলগুলো ক্ষমতার আধিপত্য দেখানোর জন্য গড়ে তুলেছে নিজস্ব মিলিশিয়া বা সশস্ত্র বাহিনী। দেশটির জনসংখ্যার ভারসাম্য ও রাজনৈতিক ভারসাম্যে যোগ হয়েছে প্যালেস্টাইনি উদ্বাস্তু। ১৯৪৮ এবং ১৯৬৭-এর আরব ইসরাইল যুদ্ধ থেকে জন্ম নেওয়া অস্থিতিশীলতার মূল কেন্দ্রে ছিল প্যালেস্টাইন ইস্যু। জর্ডানে আশ্রয় নেওয়া প্যালেস্টাইন উদ্বাস্তুদের ব্লাক সেপ্টেম্বরের পর লেবাননে আশ্রয় নেওয়ার পর লেবাননের রাজনীতির অতীত ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়। মুসলিম আধিক্য প্রাধান্য লাভ করে, ফলে প্যালেস্টাইনিদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয় খ্রিষ্টান মিলিশিয়াদের। লেবানন থেকে ইসরাইলে মামলার জবাবে দুই দুই বার ইসরাইল লেবাননের আংশিক দখল নেয় আবার আলাপ-আলোচনার পর ছেড়ে চলে যায়। লেবাননে ইরান সমর্থিত হেজবুল্লাহ ব্যাপক প্রভাব অর্জন করেছে। পশ্চিমা বিশ্বের স্বার্থ, ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত, মিশর, সিরিয়া, সৌদি আরবের আধিপত্যের লড়াই—সব মিলিয়ে লেবানন কুরুক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খঁজে পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। লেবাননের জগণকেই অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন প্রত্যয়ে বাঁচার পথ খুঁজতেই হবে।

দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পুনরায় সুসংগঠিত করতে আশু নির্বাচন একটি পদক্ষেপ বলে অনেকে বিবেচনা করলেও বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা কোনো পরিবর্তন আনবে কি না—অনেকেই সন্দিহান। তাই গোষ্ঠীগত প্রতিনিধিত্ব সংরক্ষণের সংবিধান পালটে সার্বজনীন করতে হবে। সেই দাবি নতুন করে লেবাননের আকাশে আজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

প্রশাসনের অদক্ষতা ও দুর্নীতি রাজনৈতিক সরকারের পতনের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ তৈরি করল, যেখান থেকে শিক্ষা নেবার রয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও জনকল্যাণমূলক সব অর্জন বিনষ্ট হয়। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক সরকারের নজরদারিতা গুরুত্বের অবকাশ রাখে, কারণ দুর্নীতি ও অদক্ষতার দায় শেষে রাজনৈতিক সরকারকেই বহন করতে হয়।

লেখক: স্ট্রাটেজি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আই ক্লাডস) নির্বাহী পরিচালক

সূত্র: ইত্তেফাক

 

Read previous post:
সৎ মেয়ের পর এবার প্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণ

তৃতীয় মাত্রা মেহেরপুরের গাংনীতে এক প্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে আবু তাহের নামের এক লম্পটের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার ঐ নারীর...

Close

উপরে