Logo
শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

দশ ট্রাক অস্ত্রের চালানের ধারাবাহিকতায় ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা

প্রকাশের সময়: ৫:৪৪ অপরাহ্ণ - বুধবার | আগস্ট ২১, ২০১৯

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সংযোগ

(সংগৃহিত ছবি)

তৃতীয় মাত্রা

একুশ আগস্টের গ্রেনেড হামলা আমাদের জাতীয় জীবনে এক মর্মন্তুদ ঘটনা। আন্তর্জাতিকভাবেও এ ঘটনায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। সে সময় আওয়ামী লীগের জনসভায় বিরোধী নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের সময় প্রকাশ্য দিবালোকে যেভাবে গ্রেনেড হামলা হয়, তাতে নিরাপত্তা যে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেবল প্রশ্নবিদ্ধই নয়, বরং নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাদের যোগসাজশ ও পৃষ্ঠপোষকতা এখানে স্পষ্ট। একটি সরকার যখন নিজেই সন্ত্রাসী হয়ে ওঠে কিংবা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা হয়, তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তারই এক দৃষ্টান্ত ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা।

ওই দিনের নৃশংস হামলায় অলৌকিকভাবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও দলটির তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত ও কয়েকশ’ আহত হয়। গত বছর সে গ্রেনেড হামলার রায় প্রকাশ হয়। তাতে আমরা দেখেছি ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ কীভাবে জড়িয়ে পড়ে। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালতও বলেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের’ সহায়তায় ওই হামলার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা করা হয়েছে। যেখানে রাষ্ট্রের যোগসাজশ স্পষ্ট, সেখানে নিরাপত্তার বিষয়ে বলা বাহুল্য। আমরা দেখেছি, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এতে স্পষ্ট, সে সময় নিরাপত্তার ভার যাদের ওপর ছিল- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, এনএসআই, ডিজিএফআইসহ কোনো প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন প্রধানরা তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি। এমনকি এ ঘটনার পরও সে সরকার তদন্তের নামে জজ মিয়া নাটকের অবতারণা করে।

বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের ২১ আগস্টের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চালায় হরকাতুল জিহাদের একদল জঙ্গি। ওই নৃশংস হামলায় দেশি-বিদেশি পাঁচটি জঙ্গি সংগঠন জড়িত ছিল। সংগঠনগুলো হচ্ছে- হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি), কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিন, তেহরিক জিহাদ-ই ইসলাম, লস্কর-ই তৈয়বা এবং মিয়ানমার আরাকানের সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)। এরা সবাই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। তারা বাংলাদেশকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। এ সময় তারা বিএনপি-জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতা পায়। হুজি জঙ্গিদের একটা অংশ ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সক্রিয় জঙ্গিগোষ্ঠীর জন্য অস্ত্র-গ্রেনেড পাঠানোর কাজও করে। এতে বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, মুফতি হান্নান, কাশ্মীরের হিজবুল মুজাহিদিনের নেতা ইউসুফ ওরফে মাজেদ বাটসহ অনেকে যুক্ত ছিলেন। এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া মুফতি হান্নানসহ জঙ্গিদের জবানবন্দিতে তা এসেছে। ২১ আগস্টের হামলাসহ জঙ্গিদের বিভিন্ন হামলায় কাশ্মীরি জঙ্গিদের জন্য পাকিস্তান থেকে আসা গ্রেনেডের একটা অংশ ব্যবহূত হয়েছে বলে তারা আদালতকে জানান।

লক্ষ্য করার বিষয়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের আগে ১ এপ্রিল দশ ট্রাক চালান ধরা পড়ে। দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটি এক ভয়াবহ ঘটনা। ভারতীয় বিদ্রোহী সংগঠন উলফা এ অস্ত্র চালানে জড়িত ছিল। সৌভাগ্যবশত অস্ত্র চালানকারীদের ভুল বোঝাবুঝিতে দশ ট্রাক অস্ত্রের চালান তখন ধরা পড়ে। আমরা জানি না, এর আগে এ রকম আরও কত অস্ত্র চালান হয়। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনার মতো দশ ট্রাক অস্ত্র চালানেও রাষ্ট্রযন্ত্র জড়িত ছিল। জড়িত ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর একটি অংশ। আমাদের প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে যেখানে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, সেই প্রতিবেশী দেশের বিদ্রোহী সংগঠন উলফা যেভাবে বাংলাদেশকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে, সেটি আমাদের দেশের জন্য কতটা নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তা বুদ্ধিমান মাত্রই জানার কথা। উলফা তথা ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম ভারতের মধ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চায়। তারা ভারত ফেডারেশন থেকে আসামের সার্বভৌমত্ব দাবি করে সশস্ত্র সংঘাতে নিয়োজিত। ভারত কেবল বন্ধু দেশ হিসেবেই নয়, একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবেও কি আমরা পারি প্রতিবেশীর জন্য বিপদের কারণ হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে? জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার কীভাবে জনগণেরই নিরাপত্তায় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে, দশ ট্রাক অস্ত্রের ঘটনা তারই প্রমাণ।

একটি গণতান্ত্রিক দেশে নিরাপত্তা বাহিনী রাজনৈতিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু দশ ট্রাক অস্ত্র ও ২১ আগস্টের হামলার ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশ ছিল ‘বেপরোয়া’। তারা যেন সরকারের ভেতর আরেকটি সরকার। লোভ-লালসার কারণে তারা নিজেদের দায়িত্ব ভুলে যায়। জনগণের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্বে যারা থাকেন তারাই যখন ‘ষড়যন্ত্রে’র অংশ হয়ে ওঠেন, তখন গোটা দেশই হুমকিতে পড়ে। আমরা দেখেছি, এ ভয়াবহ উভয় ঘটনায় সে সময়কার গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীগুলোর কর্তাব্যক্তিসহ তৎকালীন বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকরাও জড়িত ছিল। মূলত দশ ট্রাক অস্ত্র চালানের ধারাবাহিতায়ই ঘটে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা। যে হামলার দুঃসহ ক্ষত এখনও অনেকে বয়ে বেড়াচ্ছেন।

(সংগৃহিত ছবি)

জাতির জন্য সৌভাগ্য, ২১ আগস্টের ঘটনায় শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। আরও অনেক ষড়যন্ত্রের প্রয়াসও ব্যর্থ হয়। অবশেষে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারে আসে। ২১ আগস্টের সময়কার সরকার থাকলে অনেকে যে বলেন, বাংলাদেশ আফগানিস্তান হবে, বাস্তবেও হয়তো তা হতে পারত। আমাদের আরও স্বস্তির বিষয় হলো, গত বছর এ নৃশংস হামলার বিচার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশ কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। দেশবাসীকে আরও সচেতন হতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।

লেখক- ইশফাক ইলাহী চৌধুরী, নিরাপত্তা বিশ্নেষক ও অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর 

(সমকাল থেকে সংগৃহিত)
Read previous post:
সুন্দরবনে মারা গেল ৭ ফুট লম্বা বাঘ

সংগৃহীত ছবি তৃতীয় মাত্রা ডেস্ক রিপোর্ট : সুন্দরবনের ছাপড়াখালী এলাকা থেকে একটি বাঘের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে বন বিভাগ। প্রায় সাত...

Close

উপরে