Logo
শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ইসলামে ভ্রমণ ও সফরের তাগিদ

প্রকাশের সময়: ৪:০৩ অপরাহ্ণ - শনিবার | আগস্ট ১৭, ২০১৯

 

তৃতীয় মাত্রা

সফর বা ভ্রমণ শুধু চিত্তবিনোদনের জন্য নয়। ভ্রমণে যেভাবে চিন্তার জগৎ প্রসারিত হয়, তেমনি এতে থাকে শিক্ষণীয় উপাদান। ভ্রমণে এই শিক্ষণীয় দিকটার প্রতি কোরআন বিশেষ নজর দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘বলে দাও, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো, অতঃপর দেখো, যারা সত্যকে মিথ্যা বলেছে, তাদের পরিণাম কী হয়েছিল?’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১১)

এ আয়াতে ভ্রমণ ও সফরের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে দেখো, পূর্বকালে যারা তাদের রাসুলকে মিথ্যা বলেছে, ইহকালে তারা কী পরিমাণ শাস্তি ভোগ করেছে। আর পরকালে তো তাদের জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছেই।

দেশ-বিদেশে ভ্রমণের গুরুত্ব

পবিত্র কোরআনের অসংখ্য আয়াতে দেশ-বিদেশে ভ্রমণের প্রতি তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘বলো, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং দেখো, তোমাদের আগের লোকদের কী পরিণাম হয়েছিল! তাদের বেশির ভাগই ছিল মুশরিক।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ৪২)

মূলত সফরের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের নানা বৈচিত্র্য বিষয় অবলোকন করে জীবনের পাথেয় সঞ্চয় করা খুবই সহজ। সফরের কারণে মানুষের চোখ-কান খুলে যায়। সত্য, সঠিক পথ ও পন্থা গ্রহণে সহায়ক হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তবে কি তারা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করে না, যাতে তাদের অন্তর অনুধাবন করতে পারত এবং তাদের কান (সত্য কথা) শুনে নিত।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৪৬)

নির্দিষ্ট ভূখণ্ড থেকে বের না হলে সৃষ্টিজগতের অনেক কিছুই অজানা থেকে যায়। পৃথিবীর একেক স্থান একেক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। চিত্তবিনোদনের পাশাপাশি সেসব স্থানে চিন্তাশীলদের জন্যও রয়েছে চিন্তার খোরাক। আল্লাহ বলেন, ‘বলে দাও, তোমরা ভূপৃষ্ঠে ভ্রমণ করো এবং দেখো, কিভাবে আল্লাহ প্রথমবারে সৃষ্টি করেছেন। আবার তিনি শেষবারেও সৃষ্টি করবেন।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ২০)

সফরের প্রতি ইসলাম কখনো নিরুৎসাহ করেনি। ইসলামের একটি অন্যতম রুকন বা স্তম্ভ হলো হজ। আর হজ পালন করতে হয় দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে। ইসলামের আরেকটি রুকন হলো জাকাত। জাকাত আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো বিত্তহীন মুসাফিরকে দান করা। কারো যাত্রাপথকে মসৃণ করা। এ ছাড়া নির্দিষ্ট পরিমাণ সফরের কারণে শ্রেষ্ঠতম ইবাদত নামাজকে সংক্ষিপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এভাবেই বিভিন্ন উপায়ে ইসলাম ভ্রমণের প্রতি উৎসাহিত করেছে। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) ভ্রমণের পাঁচটি উপকারিতা উল্লেখ করেছেন। এক. দুশ্চিন্তা দূর হয়। দুই. জীবিকা অর্জন করা যায়। তিন. জ্ঞানার্জন করা যায়। চার. সৌজন্যতা ও শিষ্টাচার শেখা যায়। পাঁচ. শারীরিক সুস্থতা অর্জন হয়।

ভ্রমণের অতীত ও বর্তমান সংস্কৃতি

প্রাচীনকালে আরববাসী ব্যবসা-বাণিজ্য, জীবিকা নির্বাহ, শিকার এবং মেষ চরানোর লক্ষ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ করত। কিন্তু শিক্ষামূলক ও উপদেশ গ্রহণের জন্য ভ্রমণের আদেশটি তাদের জন্য একেবারেই নতুন ছিল। আর এ নতুন পন্থাই তাদের জাহেলিয়াতের গহ্বর থেকে টেনে তুলে উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। বর্তমানে ব্যবসা, শিক্ষা, বিনোদন, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কারণে মানুষ ভ্রমণ করে। এসব সফরও যদি কোরআনের নির্দেশের কথা স্মরণ করে ইবাদতের উদ্দেশ্যে করা হয়, তাহলে পার্থিব কল্যাণের পাশাপাশি আখিরাতের জন্য সওয়াবও অর্জিত হবে।

পর্যটন হলো জ্ঞানসমুদ্রের সন্ধান। প্রফুল্ল মন ও শারীরিক সুস্থতার জন্য মাঝেমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করা খুব উপকারী। ভ্রমণ মানুষের মনের পরিধিকে বিস্তৃত করে।

বিশ্বময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আল্লাহর সৃষ্টির লীলারহস্য। এই সৃষ্টিরহস্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনাদি মানুষকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে প্রতি মুহূর্ত। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বলেছেন, ভ্রমণ স্রষ্টার সৃষ্টিরহস্য জানায়, ভ্রমণ আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। প্রত্যেক মানুষেরই সাধ্যানুসারে কাছে কিংবা দূরে ভ্রমণের মাধ্যমে স্রষ্টার বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিকে দেখে অন্তরকে বিকশিত করা উচিত। মহান আল্লাহর বিশাল সৃষ্টি দর্শন, উপার্জন, জ্ঞান আহরণ, রোগ নিরাময় এবং আত্মশুদ্ধির জন্য ভ্রমণ করার নির্দেশ রয়েছে ইসলামে। কেউ যদি সওয়াবের নিয়তে ভ্রমণ করে, পুরো ভ্রমণেই তার সওয়াব অর্জন হবে। জ্ঞানার্জনের জন্য স্বামী-স্ত্রী সপরিবারে বা দলবদ্ধভাবে ভ্রমণে বা পর্যটনে যাওয়ায় কল্যাণ ও পুণ্য নিহিত রয়েছে। পৃথিবীজুড়ে রয়েছে আল্লাহর কুদরতের নানা কীর্তি। এসব দেখে মানুষ চিন্তা ও গবেষণা করবে। দৃঢ় করবে ঈমান ও আমল। তবে কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে সফর করার অনুমতি ইসলাম প্রদান করেনি।

নিরাপদ ভ্রমণের জন্য ইসলামের নির্দেশনা

ভ্রমণ ও চলাচল মানবজীবনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের ভ্রমণ করতে বলেছেন, যেন তারা সৃষ্টিজগতে বিদ্যমান আল্লাহর অসীম কুদরত দেখতে পারে। দুর্ঘটনায় মৃত্যুমুখে পতিত হয়। সড়ক বা ভ্রমণ দুর্ঘটনার বাহ্যিক বিভিন্ন কারণ আছে। কিন্তু ধর্মীয় পণ্ডিতরা এর কিছু ধর্মীয় কারণও উল্লেখ করেছেন। সড়ক বা ভ্রমণ দুর্ঘটনার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, প্রথমত, মৃত্যু সৃষ্ট জীবের অনিবার্য নিয়তি ও পরিণতি। ইসলামী বিশ্বাস মতে, নির্দিষ্ট সময়েই মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু পৃথিবী যেহেতু দারুল আসবাব বা কারণ-উপকরণের প্রকাশস্থল, তাই কারো মৃত্যুর জন্য ভ্রমণ দুর্ঘটনা বাহ্যিক উপলক্ষ ছাড়া আর কিছুই নয়।

দ্বিতীয়ত, পৃথিবীতে যখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না, অপরাধী মানুষ আল্লাহর ভূখণ্ডে অবাধে বিচরণ করে তখন তারা যেকোনো সময়েই ভয়াবহ আজাবে নিপতিত হতে পারে। আল্লাহর আজাব এলে অপরাধী-নিরপরাধী সবাই আজাবে পতিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা পাপাচার ও অপকর্মের ষড়যন্ত্র করে তারা কি এ বিষয়ে নির্ভয় হয়ে গেছে যে আল্লাহ তাদের ভূগর্ভে ধসিয়ে দেবেন না, কিংবা এমন দিক থেকে শাস্তি আসবে না, যা তাদের ধারণাতীত? কিংবা তিনি তাদের পাকড়াও করবেন, যখন তারা চলাফেরা করতে থাকবে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৪৫, ৪৬)

তৃতীয়ত, রাসুল (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ‘যখন সমাজে জিনা-ব্যভিচার বেড়ে যাবে তখন তাদের মধ্যে মৃত্যু ব্যাপক হয়ে যাবে…যখন বিচারকার্যে অবিচার করা হবে তখন তাদের মধ্যে খুনখারাবি ছড়িয়ে পড়বে।’ (মুয়াত্তা ইমাম মালেক)

ইসলামী শরিয়তে ভ্রমণের কিছু আদব রয়েছে, তা অনুসারে চলাফেরা করলে ভ্রমণ দুর্ঘটনা থেকে বাঁচা যাবে বলে রাসুল (সা.) ঘোষণা দিয়েছেন। নিচে এসংক্রান্ত কিছু সুন্নত তুলে ধরা হলো—

ভ্রমণে বের হওয়ার আগে কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করা। দুই রাকাত নামাজ পড়ে বের হওয়া। ভ্রমণে বের হওয়ার সময় এই দোয়া পড়া, ‘আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা ফি সাফরিনা হাজাল বিররা ওয়াত তাকওয়া, ওয়া মিনাল আমালি মা তারদা, আল্লাহুম্মা হাউইন আলাইনা সাফরিনা হাজা, ওয়াতবি আন্না বু‘দাহু, আল্লাহুম্মা আনতাস সাহিবু ফিস সাফরি ওয়াল খলিফাতু ফিল আহলি, আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন ওয়াসা-ইস সাফরি, ওয়া কা-বাতিল মানজারি, ওয়া সু-ইল মুনকলাবি ফিল মালি ওয়াল আহলি।’ একা একা ভ্রমণ না করা। কমপক্ষে দুজন মিলে ভ্রমণ করা। যেকোনো যানবাহনে আরোহণের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ পড়া। যানবাহনে বসার পর তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ পড়া। তারপর এই দোয়া পড়া, ‘সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হাজা ওয়ামা কুন্না লাহু মুকরিনিন, ওয়া ইন্না ইলা রাব্বিনা লামুনকালিবুন।’ নৌকা, জাহাজ ইত্যাদিতে ভ্রমণের সময় এই দোয়া পড়া, ‘বিসমিল্লাহি মাজরিহা ওয়া মুরসা-হা, ইন্না রাব্বি লা গাফুরুর রহিম।’ ভ্রমণের সময় সঙ্গে কুকুর না রাখা। ভ্রমণ থেকে ফিরে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা এবং এই দোয়া পাঠ করা, ‘আ-ইবুনা তা-ইবুনা আ-বিদুনা লিরব্বিনা হামিদুন।’

 

লেখক : মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

শিক্ষক, মাদরাসাতুল মদিনা, নবাবপুর, ঢাকা

 

Read previous post:
ঢাকায় পৌঁছেছে হজের ফিরতি প্রথম ফ্লাইট

তৃতীয় মাত্রা ডেস্ক রিপোর্ট : বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রথম ফিরতি হজ ফ্লাইট নিরাপদে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছে। শনিবার দুপুর আনুমানিক...

Close

উপরে