• Tuesday, 06 December 2022

ডায়ালাইসিস রুম থেকেই আলিফ বললেন ‘এখনও হাল ছাড়িনি’

ডায়ালাইসিস রুম থেকেই আলিফ বললেন ‘এখনও হাল ছাড়িনি’

ভারতের চেন্নাইয়ে ডায়ালাইসিস রুমে বসে নিজের মনোবলের কথা জানিয়েছেন কণ্ঠশিল্পী আলিফ আলাউদ্দিন। খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞ আলাউদ্দিন আলীর মেয়ে হলেও তার নিজের জীবনটা যে সহজ সরল ছিল না, নিজের সে কথা লিখলেন ভার্চুয়াল চিঠিতে। জানিয়েছেন কিভাবে সংগ্রাম করে বেড়ে উঠেছেন তিনি।

শুধু তাই নয়- অকপটে বললেন, ‘আমার কখনও নিজের জন্য মায়া কান্না আসে না। আমি খুব অদ্ভুত। আমার অসামান্য মনোবল।’ তিনি জানালেন এখনও ছাল ছাড়েননি।

নিজের জীবনের শুরুর গল্পটা আলিফ এভাবেই লিখেছেন, ‘আমার বাবা মা যখন আলাদা হয়ে যান তখন আমার বয়স অনেক কম। ক্লাস ৯ এ পড়ি। মা কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে তখন শারিরীক ভাবে দুর্বল। আমার সামনে ও লেভেল পরীক্ষা। তখনই মাথায় আসলো কিভাবে পড়াশোনা তাড়াতাড়ি শেষ করে চাকরিতে জয়েন করা যায়। মাকে প্রায় ৪০,০০০ টাকার মতো ওষুধ খেতে হতো। ও লেভেল শেষ করেই ঢুকে পড়লাম আমার স্কুল BIT- র ফ্রেঞ্চ টিচার হিসেবে চাকরি করতে। এ লেভেল না করে সরাসরি বিবিএ পড়তে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। সকাল ৮টায় ক্লাস তারপর BIT গিয়ে ক্লাস নিয়ে আবার ভার্সিটিতে ফিরে ক্লাস করা। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে টিউশনি। আর তারপর নিজের পড়ালেখা।’

দুঃসময়ে আশেপাশের মানুষের ব্যবহার ভোলেননি জানিয়ে জনপ্রিয় এই গায়িকা বলেন, ‘আমার মা ব্যস্ত হয়ে পরলেন টেলিভিশনের প্যাকেজ প্রোগ্রাম তৈরি নিয়ে। জীবনতো চলতে হবে। মজার ব্যপার হলো কিছুদিন আগেও সালমা ভাবী আলিফ আম্মু বলে ডাকা মানুষগুলোর নতুনরূপ দেখা শুরু করলাম। গায়ে মাখিনি। সময় কোথায়, অনেক কাজ ভেবে এগিয়ে গেছি। তবে মনে রেখেছি, ভুলিনি। মনে মনে রাগ পুষে রাখিনি। রাগ পুষে রাখা মানুষ আমি না। আমি শুধু মনে রেখেছি যেন দ্বিতীয়বার এরা আমাদের বোকা বানাতে না পারে।’

মায়ের কাছ থেকে মানসিক শক্তি পেয়েছেন আলিফ আলাউদ্দিন। বললেন, ‘মার কাছ থেকে পাওয়া আমার অসামান্য মানসিক শক্তি। আমার খালা মামারা পাশে না থাকলে হয়তো কিছুই করতে পারতাম না। অনেক প্রাচু্র্যে বড় হওয়া আমি এ ধাক্কাকে জয় করার নেশায় মত্ত হলাম। অনেক ছোট ছোট পথ হেঁটে লম্বা পথও পাড়ি দিয়ে ফেললাম। মাঝে খুব ভালো মনের একজন মানুষকেও জীবনসঙ্গী হিসেবে পেলাম। ঘর আলো করে আমাদের কন্যা সন্তানও এলো’

কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়েও হাল ছাড়ছেন না জানিয়ে লিখেছেন, ‘দিন সুন্দর পার হয় ঠিকই কিন্তু আমার মনে শুধু চিন্তা আমার মায়ের কিডনি রোগটা আমারও আছে। নিজের যত্ন নেবার আগেই মা আবার অসুস্থ হলেন। আবার মার ডায়ালাইসিস, আবার টেনশন। অনেক যন্ত্রণা নিয়ে মা আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন। আম্মুর কলিজার টুকড়া ছিলাম আমি। কিভাবে মা দূরে আছে সে চিন্তা করার আগেই নিজের কিডনির জটিলতা বাড়তে শুরু করলো। দিন যায় শরীর আরও খারাপ হয়। গত ৩/৪ বছর কি সময় পার করেছি তা বলে বোঝানো সম্ভব না। এখনও হাল ছাড়িনি। পরিবার বন্ধু বান্ধব যেভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, হাল ছাড়ি কিভাবে?’

বাবার বিষয়ে নেটিজেনদের বক্তব্য নিয়ে আলিফ বলেন, ‘অনেকেই আমাকে আমার ফেসবুক পেইজে এসে লেখেন আলাউদ্দীন আলীর সন্তান হিসেবে সংগীত জগতে কি করতে পেরেছেন? আমি কিছুই করতে পারিনি, চাইওনি। আলাউদ্দীন আলী লাখে একটা হয়, আমার সে গুণ নাই, আমি বাবার সাথে কম্পিটিশনে এ নামিনি। আমি চেষ্টাও করিনি, ইচ্ছাও হয়নি বিশাল কিছু করে ফেলবো। জীবনে চরকির মতো ঘুরতে ঘুরতে সে সময়ও পাইনি।’

নিজের মনোবল সম্পর্কে দৃঢ়চেতা এই গায়িকা আরও বলেন, ‘আমার কোনও আক্ষেপ নেই। মাঝে মাঝে নিজের পজেটিভিটি দেখে নিজেই অবাক হই। আমি আমার মায়ের সন্তান, বাবার সন্তান। শরীর খারাপ নিয়ে হাসি মুখে স্টেজ এ গান করি, টিভি তে শুট করি, বাড়িতে রান্না করে সবাইকে খাওয়াই। আমার কখনও নিজের জন্য মায়া কান্না আসে না। আমি খুব অদ্ভুত। আমার অসামান্য মনোবল। ধন্যবাদ পরিবার, খুব কাছের কিছু বন্ধু এবং সর্বোপরি মহান সৃষ্টিকর্তা।’

ভার্চুয়াল এই চিঠির শেষভাগে ঠিকানা এবং নিজের ডিজাটাল নামও যুক্ত করে দেন আলিফ আলাউদ্দিন।

comment / reply_from