Saturday, 26 November 2022
Logo

ইউক্রেন যুদ্ধে বন্ধ হয়নি হাসপাতালটি!

ইউক্রেন যুদ্ধে বন্ধ হয়নি হাসপাতালটি!

ইউক্রেনে আট মাস ধরে চলা যুদ্ধে পূর্ব ইউক্রেনের ইজিয়াম হাসপাতাল কখনোই কাজ বন্ধ করেনি জানা যায়। মুক্তির অপেক্ষায় হাসপাতালের বেইসমেন্টে আহত বে-সামরিক মানুষের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। খারকিভ অঞ্চলের ছোট কিন্তু কৌশলগতভাবে এই শহরটি এপ্রিল মাসে মস্কো সম্পূর্ণ দখল করে নিয়েছিল।

গত ১১ সেপ্টেম্বর ইউক্রেনীয় সৈন্যরা শহরটি পুনরুদ্ধার করে। যা কিয়েভের জন্য একটি কৌশলগত বিজয় ছিল।

তবে, যুদ্ধের আগে এখানে প্রায় ৪৬ হাজার মানুষের বাস থাকলেও তা কমে আট থেকে ৯ হাজারে নেমে এসেছে। পুনরুদ্ধারের পর হাসপাতালটি একটি জেনারেটরের সাথে সংযুক্ত হয় ও কর্মীরা ধীরে ধীরে ভাঙা জানালাগুলো প্রতিস্থাপন করেন। এতে, হাসপাতালটি কিছুটা স্বাভাবিকতার আভাস ফিরে পেতে শুরু করে।

হাসপাতালের নিচতলা বেশ উত্তপ্ত, করিডরে ব্লিচের গন্ধ। এর মধ্যে একজন রোগীকে তার পায়জামা পরে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। অন্যদিকে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী মেঝে মুছছেন এবং একজন সচিব ভর্তির ফাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছেন। হাসপাতালটি পরিচালনা করছেন ৫২ বছর বয়সী সার্জন ইউরি কুজনেটসভ। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে আজ প্রায় ২০০ রোগী রয়েছে, জুনে এই সংখ্যা ছিল ৫০। ’

মার্চ মাসে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে সৃষ্ট শূন্যস্থানও ধ্বংসের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘এখানেই আমাদের অপারেশন থিয়েটার এবং নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট ছিল।’ ‘সবচেয়ে কঠিন জিনিস বেঁচে থাকা’

ইউরির মুখ ক্লান্তিতে ছেয়ে গেছে। গত ছয় মাস ধরে প্রতিটি রাত জেগে তিনি রোগীদের চিকিৎসা করে যাচ্ছেন। ময়লা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই আহতদের দেখাশোনা করেছেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল শুরুতে, তারা আমাদের সঙ্গে কী করতে যাচ্ছে তা নিয়ে অনেক অনিশ্চয়তা ছিল। ’

তিনি জানান, ‘শুরুতে কিছু লড়াই হলেও রাশিয়ানরা তাকে ইউক্রেনীয় রোগীদের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে দিয়েছিল। এ সময় তাকে কয়েকজন নার্স সাহায্য করেছিলেন। রাশিয়ান সৈন্যরা পাশের একটি ভবনের বেইসমেন্টে তাদের নিজস্ব ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করেছিলেন। ইউরির অফিস থেকে সেটির দূরত্ব ছিল প্রায় ২০ মিটার। তিনি প্রতিদিন রুশ সৈন্যদের সঙ্গে কথা বলতেন। তারা তাকে আহত রুশ সৈন্যদের চিকিৎসা করতে বলেননি।’

তিনি সেইমব অন্ধকার দিনের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘কাজ করা আমাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন ছিল না, সবচেয়ে কঠিন জিনিসটি ছিল বেঁচে থাকা। ’

ইজিয়াম শহরটি পুনরুদ্ধার করার কয়েক সপ্তাহ পরে ইউক্রেন জানায়, তারা নিকটবর্তী একটি বনাঞ্চলে একটি গণকবর আবিষ্কার করেছে। যেখানে কমপক্ষে ৪৫০টি লাশ রয়েছে। এদের বেশির ভাগের সহিংস মৃত্যু হওয়ার লক্ষণ রয়েছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে ৩০ জনের ‘নির্যাতনের চিহ্ন’ রয়েছে।

অস্ত্রোপচারের টেবিল হিসেবে স্ট্রেচার:
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হাসপাতালটি দুজন কর্মী হারিয়েছে। একজন ফরেনসিক বিজ্ঞানী গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন ও একজন ডাক্তার নিজের বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে মারা গিয়েছিলেন।

অবিরাম বোমাবর্ষণে শহরটি বিধ্বস্ত হওয়ায় হাসপাতালের বেইসমেন্টে একটি জরুরি কক্ষ স্থাপন করা হয়েছিল। সেখানে দাগযুক্ত স্ট্রেচারগুলো কার্ডবোর্ডের বাক্স এবং ময়লার স্তূপের মধ্যে অস্ত্রোপচারের টেবিল হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

ইউরি বলেন, ‘আমরা রোগীদের হারিয়েছি, কারণ আমাদের কাছে সঠিক সরঞ্জাম এবং ওষুধ ছিল না। কিন্তু ঈশ্বরের অনুগ্রহে আমরা মৃত্যুর সংখ্যা সীমিত করতে পেরেছি। ’

উদ্ধারকৃতদের মধ্যে একজন ব্যক্তির পেটে বন্দুকের গুলি লেগেছিল। তার সম্পর্কে ইউরি বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ আগে আমার অফিসের দরজা খুলল এবং লোকটি ভেতরে এসে বলল, ‘ডাক্তার, আপনি কি আমাকে মনে রেখেছেন? আমি বেঁচে আছি।’

যুদ্ধের মধ্যে হাসপাতাল পরিচালনা করা এই চিকিৎসক স্বীকার করেন, ‘আমাদের সবারই এমন মুহূর্ত ছিল যখন আমরা পালানোর কথা ভেবেছিলাম। আমাদের সবারই বিষণ্ন ও বিষণ্নতার সময় ছিল। ’

‘কিন্তু এটি এমন মুহূর্ত ও আমার সহকর্মীদের সংহতি, যা আমাকে এখানে রেখেছে’ বলে এই চিকিৎসক হাসলেন। বাড়ি ফিরতে আগ্রহী ইউরি অবশেষে বিশ্রামের জন্য মাথা নিচু করলেন। -সূত্র : এনডিটিভি

comment / reply_from

related_post