Logo
মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২২ | ৪ঠা মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

কারিগরি শিক্ষায় ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট

প্রকাশের সময়: ১০:৩২ অপরাহ্ণ - সোমবার | ডিসেম্বর ২০, ২০২১

তৃতীয় মাত্রা

মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদা পূরনের পর ইদানিং নতুন চাহিদা হিসেবে যুক্ত হয়েছে ভ্রমণ। মানুষের ভ্রমণকে সহজ,গতিশীল, আরামদায়ক ও প্রানবন্ত করে তুলতে যে শিল্পটি বিকশিত হচ্ছে তার নাম পর্যটন শিল্প। বর্তমান পৃথিবীতে ১২০ কোটির বেশি পর্যটক পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ভ্রমণ করছে। ভ্রমণ ও পর্যটন খাতকে যুগোপযোগী ও গতিশীল করে আধুনিক মানের সেবা প্রদানে প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি।পর্যটন ও আতিথিয়েতা শিল্পে দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়নে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট সাব্জেক্ট বিশেষ ভূমিকা রাখছে। চাহিদা বাড়ছে কারিগরি শিক্ষায় দক্ষতা ভিক্তিক খাত অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলএর তথ্যানুযায়ী,২০১৮ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে ট্রাভেল এ্যান্ড ট্যুরিজম এর অবদান ৪.৪ এবং অর্থনীতিতে ট্রাভেল এ্যান্ড ট্যুরিজম এর অবদান ১১.৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার ও এখাতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ২,৪১৪,৪০০ টি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

পর্যটন শিল্পের সাথে যুক্ত সেবা খাতগুলো যেমন আবাসন (হোটেলে মোটল,রিসোর্ট) , পরিবহন (এয়ারলাইনস, ক্রস,ট্রেন, বাস), খাদ্য-পানীয় (রেস্টুরেন্ট,বার,রেস্তরাঁ), বিনোদন ( পার্ক, মুভি থিয়েটার, বিনোদন কেন্দ্র),ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ট্রাভেল এজেন্সি ট্যুর অপারেটর ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এইসব সেবামূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রয়োজন খাত ভিক্তিক দক্ষ জনশক্তি। বাংলাদেশে এয়ারলাইনস, এয়ারপোর্ট,হোটেল,মোটেল,রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ই-টিকেটিং,ট্রাভেল এজেন্সি, ট্যুর অপারেটর কোম্পানিগুলোতে কাজের সুযোগ দিন দিন বাড়ছে।বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে দক্ষতা ভিক্তিক মানব সম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন, বিকাশ, আধুনিক মানের পর্যটন সেবা ও শিল্প গঠনের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

দিন দিন বাণিজ্যিকভাবে এভিয়েশন সেক্টরের সম্ভাবনা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে দক্ষ জনবলের চাহিদাও। বিশ্বে, ১১৮টি বিভিন্ন দেশের ২৯০ টি এয়ারলাইন্স তাদের এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা “ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (IATA) এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন টার্মিনালে তাদের সময়সূচী অনুযায়ী ফ্লাইট পরিচালনা করছে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (ICAO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ ফ্লাইট চলাচল করে। বিমান পরিবহনের প্রেক্ষাপট থেকে, বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত লাভজনক গন্তব্য হওয়ায় সমস্ত গন্তব্যের মধ্যে এগিয়ে  রয়েছে। এয়ারলাইন্স ইন্ডাস্ট্রিতে সম্মানজনক ও আন্তর্জাতিকমানের চাকরির করার সুযোগ সৃষ্টি করছে বিভিন্ন বিভাগে  যেমন- এয়ারপোর্ট অপারেশন, কার্গো অপারেশন, এয়ারপোর্ট সার্ভিস, গ্রাউন্ড অপারেশন, জিএসএ অপারেশন, কাস্টমার সার্ভিস, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং, টিকেটিং এবং রিজার্ভেশন, কেবিন ক্রুরু এবং এয়ার হোস্টেজ, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ইত্যাদি।

বাংলাদেশে ৪০ টির বেশি এয়ারলাইন্স (যাত্রী ও কার্গো অপারেশন) বাংলাদেশ থেকে সরাসরি তাদের বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে। দেশে ৬৬ টি এয়ারলাইন্সের জিএসএ অফিস রয়েছে(সুত্র-আটাব)। আরো ১২ টি এয়ারলাইন্স বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বেবিচক বরাবর আবেদন দাখিল করেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, এমিরেটস এয়ারলাইন্স, টার্কিশ এয়ারলাইন্স, ইতিহাদ এয়ারওয়েজ, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, থাই এয়ারওয়েজ, ক্যাথে প্যাসিফিক, ড্রুক এয়ার, মালদ্বীপ এয়ারলাইন্স, চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স, চায়না ইস্টারনা এয়ারলাইন্স, ইজিপ্টিয়ান এয়ারওয়েজ, ফ্লাই দুবাই, কাতার এয়ারওয়েজ, এয়ার এরাবিয়া, এয়ার ইন্ডিয়া , ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, নভো-এয়ার, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ছাড়াও আরো কয়েকটি নামীদামী এয়ারলাইন্স বাংলাদেশ থেকে তাদের পরিষেবা পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং বাণিজ্যিক IATA টিকিটিং এবং ট্রাভেল এজেন্টদের সংগঠন “দ্য অ্যাসোসিয়েশন অফ ট্রাভেল এজেন্টস অফ বাংলাদেশ (ATAB)” এই সেক্টরটিকে বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করছে। বিমানবন্দর সার্ভিস, গ্রাউন্ড অপারেশন, প্রচার ও উন্নয়ন, টিকিটিং সেবা, ফ্লাইট সার্ভিস এবং অফিস ব্যবস্থাপনার জন্য আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতে প্রায় ৩৫ হাজার দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হবে। এছাড়াও আটাব সদস্যপদপ্রাপ্ত (৩৫০০ ট্রাভেল এজেন্সি) এর অধীনে IATA স্বীকৃত ট্রাভেল এজেন্সিগুলিতেও দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন এই বানিজ্যিক সংগঠনটি।

ট্যুর প্যাকেজিং ট্রাভেল এজেন্সি এবং ট্যুর অপারেটর কোম্পানিগুলতে কাজের সুযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতে প্রভাষক, শিক্ষক এবং প্রশিক্ষক হিসাবে পেশায় যুক্ত হবার সুযোগ আছে। হোটেল ও আবাসন খাতে ফ্রন্ট অফিস, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং, হাউসকিপিং, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, সিকিউরিটি এবং ট্রাভেল ডেস্কের মতো বিভিন্ন বিভাগে প্রচুর সংখ্যক চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশে ১৭টি বেশি পাঁচ তারকা,৬টি চার তারকা,১৩ টি তিন তারকা  আন্তর্জাতিক চেইন হোটেল তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম দিন দিন বাড়ছে। এছাড়াও, বাংলাদেশে ৫০০ টির বেশি রিসোর্ট থাকায় বর্তমানে রিসোর্ট ব্যবস্থাপনা এবং রিসোর্টে চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

এই সেক্টরে পেশাদারিত্ব বিকাশের জন্য সরকার শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রকল্প অব্যাহত রেখেছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ভ্রমণ ও পর্যটন খাতে ২ লাখের বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল (ডব্লিউটিটিসি) ২০১৫ সালে রিপোর্ট করেছে যে বাংলাদেশের ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্প ২০১৪ সালে সরাসরি ০.৯০৩ মিলিয়ন চাকরি বা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ১.৬ শতাংশ তৈরি করেছে, যা বিশ্বব্যাপী ১৭৮ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে ১৫৭ তম স্থান দিয়েছে। শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান মোট ১.৯৮ মিলিয়ন চাকরি বা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৩.৬ শতাংশ। WTTC ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে ২০২৫ সালের মধ্যে, ভ্রমণ এবং পর্যটন সরাসরি ১ মিলিয়ন কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং সামগ্রিকভাবে ২.৫ মিলিয়ন চাকরি বা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৪.১ শতাংশ অবদান রাখবে।

বাংলাদেশ সরকার দেশের ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি শিল্প আধুনিকায়নের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ILO-এর সাথে কানাডা সরকারের আর্থিক সহায়তায় ILO-BSEP, SEIP প্রকল্প, BTEB-NTVQF প্রশিক্ষণ প্রকল্প চালু করেছে।দেশে ১০ টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ১৪ টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালইয়ের অধীতে ১০ টি কলেজ ও ইনিস্টিটিউটে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উপর ব্যাচেলর প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। কারিগরি শিক্ষায় সেক্টর অনুযায়ী দক্ষতা ভিক্তিক লোকবল সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৮ টির বেশি ইনিস্টিটিউটে ট্রেড ভিক্তিক প্রশিক্ষণ প্রকল্প চলমান আছে। এই দক্ষতা ভিক্তিক প্রশিক্ষণ প্রকল্পের অধীনে যেসব শিক্ষার্থী তাদের প্রশিক্ষণ শেষ করেছে তারা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী পর্যটন ও বিমান চলাচল,ট্রাভেল ও আতিথিয়তা শিল্পের বিভিন্ন খাতে চাকরি পেতে সক্ষম হবে। যারা এই সেক্টরে কাজ করতে আগ্রহী তারা ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, এভিয়েশন ম্যানেজমেন্ট, ট্রাভেল এজেন্সি অ্যান্ড ট্যুর অপারেশনস, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, কার্গো অপারেশন, বিএসপি অপারেশন, টিকিট ও রিজার্ভেশন, হোটেল ম্যানেজমেন্ট, ফ্লাইট অপারেশন ম্যানেজমেন্ট, ট্যুর গাইডিং, ট্রাভেল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে দক্ষতা ভিক্তিক প্রশিক্ষণ নিয়ে এই শিল্পে ক্যারিয়ার গঠনে সুবিধা পেতে পারেন।

মোঃ সাইফুল্লার রাব্বী

প্রভাষক ও কোঅর্ডিনেটর, ট্যুরজিম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজম্যান্ট বিভাগ।

ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি(জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়- ব্যাচেলর প্রোগ্রাম)।

এসেসর- ট্যুরজিম এন্ড হসপিটালিটি সেক্টর, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।

Read previous post:
পাইকগাছা ওসি সাথে সাংবাদিক জোটের মতবিনিময়

তৃতীয় মাত্রা পাইকগাছা (খুলনা)প্রতিনিধি : পাইকগাছা থানার ওসি মোঃ জিয়াউর রহমানের সাথে পাইকগাছা সাংবাদিক জোটের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মতবিনিময়...

Close

উপরে